আইন অনুযায়ী মানব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও দেশে কিডনির ব্যবসা যেভাবে চলছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। বৃহস্পতিবারের সমকালে প্রকাশ, জয়পুরহাটের কালাইয়ে বংশ পরম্পরায় চলছে কিডনির অনৈতিক বাণিজ্য। বুধবার সমকালসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে, অনলাইনে যথারীতি 'দোকান' খুলে কিডনির ব্যবসা করছে একটি চক্র। তারা গ্রামের গরিব অসহায়দের টার্গেট করে কিডনির মতো স্পর্শকাতর অঙ্গ কেনাবেচার কাজ করছে। সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অন্তত ৩১ গ্রামে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিন শতাধিক অভাবী মানুষ তাদের একটি করে কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। সেখানে একটি পরিবারে বাবার পর ছেলে যেমন এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি আরও অনেকেই দালালির সঙ্গে যুক্ত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় এখন প্রকাশ্যেই চলছে কিডনির ব্যবসা। প্রায়ই মানুষ কিডনি বিক্রির জন্য ঢাকায় ছুটছেন। কিডনি বিক্রি করে ফেরার পর তারাই আবার দালাল বনে যাচ্ছেন।

আমরা বিস্মিত, অন্তত দশ বছর ধরে কিডনি ব্যবসার মতো অপরাধ কীভাবে অবলীলায় চলছে! একই সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমেও 'বাংলাদেশ কিডনি ও লিভার পেশেন্ট চিকিৎসাসেবা' এবং 'কিডনি-লিভার চিকিৎসাসেবা' নামে দুটি পেজের মাধ্যমে একটি চক্র যেভাবে কিডনি কেনাবেচার কাজ করত, তাও কম বিস্ময়কর নয়। তারা দুই তিন লাখ টাকায় মানুষের কাছ থেকে কিডনি কিনে পনেরো-বিশ লাখ টাকায় বিক্রি করত। এই চক্র বিদেশে শতাধিক কিডনি বিক্রি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বলাবাহুল্য, এ চক্রেরও কিডনি সংগ্রহের ভিত্তি জয়পুরহাট!

স্বস্তির বিষয় হলো, সম্প্রতি জয়পুরহাট ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই ফেসবুক চক্রের হোতাসহ পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এ চক্র গ্রেপ্তার হলেও জয়পুরহাটে 'পৈতৃক ব্যবসা' হিসেবে এখনও অনেকে কিডনি কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছেন। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনও কালাইয়ের অন্তত ২২ জন কিডনি দিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থান করছেন। আমরা দেখছি, কিডনির সরবরাহ জয়পুরহাট থেকে হলেও এ ব্যবসা মূলত ঢাকা থেকে কয়েকজন 'মহাজন' নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সমকালের সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে সক্রিয় দালাল তারেক আযম ওরফে বাবুল চৌধুরী, সাইফুল ইসলাম এবং আব্দুস সাত্তার কয়েক বছর আগে গ্রেপ্তার হলেও তারা জামিনে ছাড়া পান। সম্প্রতি অনলাইনে এ চক্রের যে পাঁচজনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে, তাদেরও এদের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। আমরা মনে করি, এরা ছাড়াও কিডনি কেনাবেচার সঙ্গে আর কারা জড়িত রয়েছে এবং জয়পুরহাট ছাড়াও দেশের আর কোথায় এই অনৈতিক ব্যবসা চলছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

আমরা জানি, প্রত্যেকের দেহে দুটি কিডনি থাকে; কিডনির মধ্য দিয়ে নিরন্তর রক্ত প্রবাহিত হয় এবং তা বর্জ্য পদার্থ পৃথক করে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। একটি কিডনি সচল থাকলেও মানুষ বাঁচতে পারে এবং কেউ স্বেচ্ছায় চাইলে কাউকে একটি একটি কিডনি দান করতে পারেন। কিন্তু কিডনি নিয়ে কেনাবেচা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারও দেহ থেকে একটি কিডনি বের করে আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া যার একটি কিডনি নেই তার শারীরিক জটিলতাও বাড়ার শঙ্কা থাকে। মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই কিডনি ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব।

আমরা প্রত্যাশা করি, জয়পুরহাটে স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে সক্রিয় হবে। পাশাপাশি গ্রামের মানুষদেরও সচেতনতা জরুরি। কিডনি বিক্রি করলে আইন অনুযায়ী শাস্তির কথা যেমন সবাইকে জানাতে হবে, তেমনি এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে গুরুতর শারীরিক অসুবিধার বিষয়টিও বোঝাতে হবে। এ ছাড়া কোনো দালাল কিডনির জন্য যোগাযোগ করলে তা যাতে সহজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে পারে তাও বলা দরকার। খবরে প্রকাশ, দালাল চক্র মানবিকতার দোহাই দিয়েই কিডনিদাতাদের সংগ্রহ করত। নিজের আত্মীয়ের কিডনি লাগবে এবং এতে দাতা ও গ্রহীতা দু'জনেরই জীবন রক্ষা পাবে। দাতা অনেক টাকাও পাবে। বস্তুত এসব কেবলই ধোঁকা। কিডনি ব্যবসার শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে হবে।