দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও এখনও পুরোদমে শ্রেণি কার্যক্রম চালু হয়নি। প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণি আর মাধ্যমিকে দশম কিংবা এসএসসি পরীক্ষার্থী ছাড়া বাকিরা সবাই সপ্তাহে এক দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। এক-দুই ঘণ্টা করে ক্লাস হচ্ছে। এরই মধ্যে এক মাস না পেরুতেই কয়েকদিন আগে মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষার রুটিন দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। যেখানে শ্রেণি কার্যক্রমই নিয়মিত হচ্ছে না, সেখানে এত দ্রুত পরীক্ষার রুটিন দেওয়া এবং আগামী ২৪ নভেম্বর থেকে বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
এটা ঠিক যে, আগের নিয়মে বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না। রুটিন অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষায় তিন বিষয় এবং মাদ্রাসায় চার বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। বাকি ৫০-এর ৪০ অ্যাসাইনমেন্ট এবং ১০ নম্বর স্বাস্থ্যবিধি মানা ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর। এই রুটিন নিঃসন্দেহে অভিনব। কিন্তু সময়টা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেবল তিন বিষয় তথা বাংলা, ইংরেজি ও গণিতেরই কেন পরীক্ষা হবে, সে প্রশ্নও এড়াবার সুযোগ কম। এটাকে বলা যেতে পারে মন্দের ভালো। মানে গত বছর যেভাবে অটোপাস দেওয়া হয়েছিল, তা করে পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণিতে পৌঁছার ব্যবস্থা। কিন্তু এ সময়ে কেন। এ সময়ে বরং পদক্ষেপ নেওয়া উচিত শ্রেণি কার্যক্রম আরও বাড়ানো। তথা সপ্তাহে এক দিনের জন্য না করে সবাই যেন নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের রুটিনে পরীক্ষার সিলেবাসের কথা এভাবে বলা আছে :'যে সকল অধ্যায় থেকে অ্যাসাইনমেন্ট (বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ গণিত বিষয়) দেওয়া হয়েছে সে সকল অধ্যায় এবং ১২/০৯/২০২১ খ্রি. হতে শ্রেণি কক্ষে যে সকল অধ্যায়ের ওপর পাঠদান করা হয়েছে তা ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেবাস।' প্রশ্ন হলো ১২ সেপ্টেম্বর থেকে যে পাঠদানের কথা বলা হয়েছে, তা কতটা হয়েছে। সপ্তাহে এক দিন মাত্র ২ বিষয়ে ক্লাস হলে এ ক'দিনে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে ২/৩টার বেশি ক্লাস হওয়ার কথা নয়। তারচেয়ে বড় বিষয় গত দেড় বছরে যারা অনলাইনে সেভাবে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেয়নি, তাদের বিষয় কি আমরা ভেবেছি?
শহরের শিক্ষার্থী এবং গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন অনেক পরিবারই হয়তো করোনায় দেড় বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পেরেছে। কিন্তু করোনার সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই যে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে ছিল তা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপেই স্পষ্ট। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও বেসরকারি সংস্থা একশনএইডের জরিপে এসেছে, অনলাইন পাঠের বাইরে রয়ে গেছে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী। কাণ্ডজ্ঞান থেকেই এটা বোঝা যায়, গ্রামে অনেক শিক্ষার্থীই ডিভাইস-ইন্টারনেটসহ নানা সমস্যার কারণে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে সেভাবে অংশ নিতে পারেনি। এখন ঠিকভাবে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু না করে তাদের বার্ষিক পরীক্ষায় বসানোর মানে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের দুই বছরের 'লার্নিং গ্যাপ' বা শিখন শূন্যতায় ফেলে দেওয়া।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছর যে শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল সে অটোপাসে উঠে গেল সপ্তম শ্রেণিতে। সপ্তম শ্রেণিতে উঠেও সশরীরে ক্লাস হয়নি। এর মধ্যেই ১২ সেপ্টেম্বর ক্লাস খুললেও শ্রেণি কার্যক্রম সেভাবে চালু হয়নি। সপ্তাহে এক দিন দুই আড়াই মাস ক্লাস করে পরীক্ষা দিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠে গেলে মাঝে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির সিলেবাসের কী হবে?
বিশেষ করে অনলাইনে যে সব শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি, তাদের তো সিলেবাস শেষ হয়নি। এটা কোনো সাধারণ গ্যাপ নয়; প্রায় দুই বছরের গ্যাপের মধ্যেই কোনো ধরনের পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত যথোচিত নয়। বলাবাহুল্য, পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা পারবে না কিংবা পাস করবে না- এমনটি বলা যাবে না। কিন্তু শিখন শূন্যতার বিষয়টি অবশ্যই দেখতে হবে এবং সেটি পূরণ না করে সামনে এগোনোর ক্ষতি হবে দীর্ঘমেয়াদি।
প্রশাসনের যুক্তি যদি হয়, স্বাভাবিক সময়ের মতো নভেম্বরেই বার্ষিক পরীক্ষা নিতে হবে। তাহলে তারা কেন সব বিষয়ের পরীক্ষা নিচ্ছে না? করোনা পরিস্থিতি মাত্র উন্নতি লাভ করছে। এ সময়টায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমে অভ্যস্ত হয়েছে। এখন পূর্ণোদ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম চালু করা জরুরি। ছুটির দিন ছাড়া সপ্তাহে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা করে এখন ক্লাস হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে, সঙ্গে এ কাজটিও সম্পন্ন করা জরুরি। আমরা দেখেছি, শিক্ষাবিদরাও পরামর্শ দিয়েছেন, সংকটের এ সময়ে একেবারে জানুয়ারি-ডিসেম্বরেই শিক্ষাবর্ষ সম্পন্ন করতে হবে- এমনটি নয়। বরং শিক্ষাবর্ষ দু'তিন মাস বাড়ালেই বা ক্ষতি কী।
আমরা জানি না, মাধ্যমিকে পরীক্ষার এ তোড়জোড় দেখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও প্রাথমিকে এভাবে বার্ষিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে দেয় কিনা। তবে প্রাথমিকে একটা ভালো কাজ হয়েছে। এ বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা হচ্ছে না। বস্তুত এ পরীক্ষাটি একেবারে বাদ দেওয়ার পক্ষপাতি অনেকেই। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে এটি না থাকারই কথা। সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে আরেকটু ধৈর্য ধরা উচিত। এখনই বার্ষিক পরীক্ষার ঘোষণা না দিয়ে আরও অন্তত দুই-তিন মাস শ্রেণি কার্যক্রম চালানো উচিত এবং শ্রেণি কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে চালু করা দরকার। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতেই এটি জরুরি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরও বিষয়টি ভাবতে পারে।
সাংবাদিক ও শিক্ষা গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com