আজ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদের (সা.) একই সঙ্গে জন্ম ও ওফাতের দিন। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে হিজরি ১২ রবিউল আউয়াল একইসঙ্গে আনন্দ ও বেদনার দিন। তিনি ৬৩ বছরের জীবনে যে পথরেখা অঙ্কন করে গেছেন, তা বিস্ময়কর। নবুয়তের আগে তিনি কৈশোরেই সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার জন্য পরিচিত ছিলেন আলামিন বা বিশ্বস্ত হিসেবে। এ সময় তিনি হিলফুল ফুজুল বা শান্তিসংঘ গঠনের মাধ্যমে মক্কা থেকে যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচার ও সন্ত্রাসবাদ উচ্ছেদ করে আদর্শ সমাজ গঠনে সচেষ্ট হন। তার জন্ম ও নবুয়ত লাভের মধ্য দিয়ে সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায্যতার বাণী নিয়ে বিশ্বে এক নতুন ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। নবুয়ত লাভের পর মাত্র ২২ বছরে তিনি যে ইসলাম সম্প্রসারিত করেছিলেন, তা আজও দিকে দিকে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও তার সংস্কার মহান নজির হয়ে আছে। মহানবী (সা.) কুসংস্কারে জর্জরিত ও সংঘাতে লিপ্ত আরব জাহানকে আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে শান্তি ও সৌহার্দ্যের পতাকাতলে যেভাবে সংগঠিত করেছিলেন, তা মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য নজির। মানুষে মানুষে ভেদাভেদের সমাজে তিনি প্রত্যেকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অবহেলিত নারীকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন। ক্রীতদাস, শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রত্যেকের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করে গেছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। এ বছর এমন সময়ে আমাদের মাঝে পবিত্র দিনটি এসেছে, যখন আমরা দেখছি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে যেমন হামলা করা হয়েছে, তেমনি তাদের ঘরবাড়িও আক্রান্ত হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব সাম্প্রদায়িক কাজ মহানবীর (সা.) নির্দেশনা ও ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসুলের (সা.) ওপর আনীত বিধান আল কোরআনে এমনকি অন্য ধর্মের দেবদেবীদের গালি দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনের ভাষ্য হলো, 'তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। যাতে করে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে।' যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেওয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) এও বলেছেন, 'কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।' বিশ্বনবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণেও বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। আমরা দেখেছি, অনেক অন্যায়-অত্যাচার, আঘাত-আক্রমণ সয়েও তিনি ন্যায়ের পথে অবিচল ছিলেন। এমনকি প্রাণ রক্ষায় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে হিজরত করতে হয়েছে মদিনায়। কিন্তু কখনও মানুষের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা হিংসার সামান্যতম প্রকাশ তার মধ্যে দেখা যায়নি। আজ তার দেখানো পথ থেকে মুসলমানরা বিচ্যুত হয়েছে বলেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে তারা নির্যাতিত। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিভক্তি, হানাহানি, রাহাজানিও আজ এ কারণেই স্পষ্ট। মানুষের প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনয়ী চরিত্র, বিনম্র ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসেবা ও মানবকল্যাণ সুনিশ্চিত করা তার জীবনের অন্যতম আদর্শ। তিনি মানুষকে সংযমী হওয়ার শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, ব্যক্তিগত জীবনেও তা করে দেখিয়েছেন। কাজের মাধ্যমে তিনি প্রত্যেকের মনে মানুষ যে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি- এই বোধ জাগ্রত করেছিলেন। রাসুল (সা.) তার জীবনে উদারতার যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, তাও বিরল। বন্ধু হিসেবে তিনি যেমন বিশ্বস্ত ছিলেন, তেমনি পিতা হিসেবে কিংবা স্বামী হিসেবেও তিনি আদর্শ। তিনি যেমন ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শনের কথা বলেছেন, আবার বড়দের শ্রদ্ধা করার কথাও বলতে ভোলেননি। মিলাদুন্নবীর এই দিনের প্রত্যাশা, মহানবীর (সা.) জীবন ও আদর্শ সবার জন্য পাথেয় হোক। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আমরা সমকালের পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা জানাই।