অর্ডার নিয়ে পণ্য সরবরাহ না করার দায়ে অভিযুক্ত ১১ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের পাওনা অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র ১৩৬ কোটি টাকা। আর পেমেন্ট গেটওয়েতে গ্রাহকদের ৪৮২ কোটি টাকা আটকে আছে। ভুয়া পেমেন্ট অর্ডার বা চেকের বিপরীতে হিসাব থেকে বেশিরভাগ অর্থ প্রতিষ্ঠানের মালিকরাই তুলে নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থ কোথায় গেছে, তা উদ্ঘাটনে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এর বাইরে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

অর্ডার নিয়েও পণ্য সরবরাহ না করায় সমালোচনার মুখে প্রথমে গত ২২ জুন ১০ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ধরনের কার্ড লেনদেন স্থগিত করে ব্র্যাক ব্যাংক। এরপর একে একে অন্য ব্যাংকও এসব প্রতিষ্ঠানে কার্ডে পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে বিকাশও লেনদেন স্থগিত করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, কিউকম, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপ, আলাদিনের প্রদীপ, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট ও নিডস ডটকম বিডি। এই ১০টির বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান রিং আইডির ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অভিযুক্ত ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা, ক্রেতা ও মার্চেন্টদের কাছে মোট দায়ের পরিমাণ, লেনদেনসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য চেয়ে গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১২ সেপ্টেম্বর চিঠির জবাবে বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান দিয়ে এসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নিরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিরীক্ষা না করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের দিকেই চেয়ে আছে বলে জানা গেছে। এই ১০ ই-কমার্সের বাইরে বর্তমানে অন্তত ৬০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে নজরদারিতে রেখেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম গত রোববার সমকালকে বলেন, ১০ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিদর্শন কার্যক্রম চলমান আছে। পরিদর্শন শেষ হলে সরকারকে তথ্য দেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে ১০ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যে পরিমাণ অর্থ আছে, তা গ্রাহকদের পাওনার তুলনায় সামান্য। বাকি অর্থ কোথায় গেছে, তা বের করার চেষ্টা চলছে। টাকা ফেরত পেতে বিভিন্ন পক্ষের আন্দোলনের মধ্যে ই-কমার্সে প্রতারিত গ্রাহকদের অধিকার রক্ষায় সরকারের করণীয় নির্ধারণে গত ১২ অক্টোবর উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অনৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমাসহ মালিকদের থেকে টাকা উদ্ধারের পদ্ধতি নির্ধারণ করবে এ কমিটি। কমিটি গঠনের আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে অর্থ ফেরতের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রাথমিকভাবে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেছে, একজন গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ডের সীমা ৯ লাখ টাকা। তিনি নির্ধারিত সীমার আলোকে একই মাসে একাধিকবার পণ্য কিনেছেন। প্রতিবার ক্রেডিট কার্ডের বিল সমন্বয় করে নতুন অর্ডার দিয়েছেন। পণ্য বুঝে পাওয়ার আগেই বারবার নতুন অর্ডার করেছেন। ওই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মার্চেন্টের অর্থ পরিশোধ করেনি। নগদে অর্থ তুলে নিয়েছে। অস্বাভাবিক মূল্য ছাড়ের কারণে অনেকে একে বিনিয়োগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিয়েছে। এর একটি উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা একবারে ১০টি বাইকের অর্ডার করে আর টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কোনোভাবে তার নিজের ব্যবহারের জন্য এত বাইকের অর্ডার দেওয়ার কথা নয়।

ইভ্যালি: ইভ্যালিতে গ্রাহক ও পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আটকে আছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ ইভ্যালি, এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের নামে পাঁচ ব্যাংকে ছয়টি অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশ ব্যাংক পেয়েছে মাত্র ৪৭ লাখ টাকা। তিনটি পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের আছে ১৫ কোটি টাকা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তাদের গ্রেপ্তারের পরদিন র‌্যাবের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে করে জানান, গ্রাহক ও সরবরাহকারীরা ইভ্যালির কাছে এক হাজার কোটি টাকার মতো পাবে। এর কয়েক দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে রাসেল দাবি করেন, তাদের কাছে পাওনা ৫৪৩ কোটি টাকা।

কিউকম: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে কিউকম। অস্বাভাবিক ছাড়ে বাইক বিক্রি করে আলোচনায় আসা প্রতিষ্ঠানটির কাছে মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এরমধ্যে পেমেন্ট গেটওয়েতে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের আটকে আছে ৩৯৬ কোটি টাকা, যা সর্বাধিক। ফস্টার পেমেন্ট ছিল কিউকমের পেমেন্ট গেটওয়ে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ফস্টারের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের পর এখান থেকে টাকা সরানো যায়নি।  ফলে কিউকমের গ্রাহকদের কিছু টাকা ফেরত পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। প্রতারণার দায়ে গত ৩ অক্টোবর কিউকমের কর্ণধার মো. রিপন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ। ফলে গ্রাহকরা কবে নাগাদ অর্থ ফেরত পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ই-অরেঞ্জ: ই-অরেঞ্জের কাছে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের পাওনা প্রায় ১১শ কোটি টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে আছে মাত্র তিন কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার টাকা। আর পেমেন্ট গেটওয়েতে রয়েছে ৩১ কোটি টাকা। মূল কর্ণধার ও গুলশান থানার পরিদর্শক শেখ সোহেল রানা নেপালে পালানোর সময় গত ৪ সেপ্টেম্বর ভারতে আটক হন। তবে প্রতারণার একাধিক মামলায় এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও সোহেল রানার বোন সোনিয়া মেহজাবিন, বোনের স্বামী মাসুকুর রহমান ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

ধামাকা শপিং: ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেডের নামে নিবন্ধন নিয়ে ধামাকা শপিং নামে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে গ্রাহক ও মার্চেন্টের ৮০৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটির অফিস বন্ধ, মালিকরা পলাতক। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ৯৪ হাজার ৭৩১ টাকা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়েতে গ্রাহকদের আছে ১৮ লাখ টাকা। অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত ৯ সেপ্টেম্বর বনানী থানায় ইনভেরিয়েন্ট টেলিকমের এমডি জসীম উদ্দিন চিশতী, তার স্ত্রী সাইদা রোকসানা খানম, তিন ছেলে এবং পরিচালক সাফওয়ান আহমেদের নামে মামলা করে সিআইডি। এখনও এদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম রানাসহ তিনজনকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

আলেশা মার্ট: আলেশা মার্টের কাছে গ্রাহকদের পাওনার পরিমাণ জানা যায়নি। তবে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে আছে ৩৯ কোটি টাকা। ব্যাপক ছাড় নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ার পর গত জুলাইতে আলেশা মার্টের চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদার সংবাদ সম্মেলন করে জানান, গ্রাহক আকর্ষণে প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেলে ভর্তুকি দেয়। গত ১৮ জুলাই পর্যন্ত তাদের ভর্তুকির পরিমাণ ৩৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৪০ কোটি টাকা মুনাফা থেকে এবং অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হয় ২১০ কোটি টাকা।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: সিরাজগঞ্জ শপের মালিক জুয়েল রানা ও আকরাম হোসেন বেশ কিছুদিন ধরে পলাতক। প্রতিষ্ঠানও বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গত ৩ অক্টোবর ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৯ হাজার টাকা ভুয়া রিফান্ড নেওয়ার অভিযোগে মামলা করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান 'নগদ'। পেমেন্ট গেটওয়েতে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের আটকে আছে মাত্র চার লাখ ৪০ হাজার টাকা। অন্তত শতকোটি টাকা নিয়ে এখন পলাতক আলাদিনের প্রদীপের প্রধান নির্বাহী মেহেদী হাসান মুন। বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়েতে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের আছে মাত্র ৮০ হাজার টাকা। বুমবুম শপিংয়ের কাছে গ্রাহক ও মার্চেন্টের প্রকৃত পাওনার পরিমাণ জানা যায়নি। তবে পেমেন্ট গেটওয়েতে মাত্র ৬৮ লাখ টাকা আছে। পেমেন্ট গেটওয়েতে আদিয়ান মার্টের ৮৭ হাজার এবং নিডস ডটকম বিডির গ্রাহকদের আছে মাত্র ৩ হাজার টাকা।