আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ বছর এমন সময় আমরা দিবসটি পালন করছি, যখন করোনা মহামারির কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা এক কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনার ফলে পাঁচ মাসেরও অধিক সময় লকডাউন চলাকালীন গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করেছে। এই খাত থেকে সরকার বার্ষিক গড়ে ২০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে। অথচ এই করোনা মহামারি দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার শ্রমিকদের জন্য তেমন অর্থ ও খাদ্য বরাদ্দ করেনি। লকডাউন চলাকালে সরকারের পক্ষ থেকে দু'বারে তিন হাজার ২২৩ কোটি ছয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিবহন শ্রমিকদের নামে বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দকৃত টাকা পরিবহন শ্রমিকরা সঠিকভাবে পায়নি।
দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত সময়োপযোগী উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। যে দেশ যোগাযোগ ব্যবস্থায় যত আধুনিক সে দেশ তত উন্নত। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সড়কের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে গন্তব্য পৌঁছে যাওয়া যায়। দেশে প্রায় ছয় লাখ অটোরিকশা, সিএনজি, পেট্রোল-ডিজেলচালিত থ্রি-হুইলার চলাচল করে। এ ছোটযানে ১৯৫৬ সাল থেকে চলাচল শুরু করে এ পরিবহন গ্রাম-শহরে দিন-রাত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে আসছে। ১৯৬৯ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি আন্দোলনে শ্রমিকরা সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক চালক অংশগ্রহণ করেছিল। এই শ্রমিকরা দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে থাকে। এই শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই, পেনশন নেই। শ্রমিকরা স্ব-উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এ পেশায় সেবা দিয়ে আসছে।
আজ ২২ অক্টোবর; জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস অনেক প্রাণের বিনিময়ে জাতীয়ভাবে পালনের স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমরা তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে অপরিকল্পিতভাবে ২২টি মহাসড়ক ঘোষণা করে। সেই মহাসড়কের পাশে রয়েছে অপরিকল্পিত হাটবাজার। সেখানে ধান-পাট শুকানো হয়; গরু-মহিষ-ছাগল চরানো হয়। সেখানে রয়েছে শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনাই মূলত দায়ী। তাই দেশের সড়ক নিরাপদ করতে হলে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে আমরা মনে করি। মহাসড়কের পাশে তিন চাকার ছোট গাড়ির জন্য বাইলেনসহ ডিভাইডার তৈরি করার কথা সরকারের উচ্চ মহল থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে। বিগত দিনে আমরা আশার বাণী ছাড়া কিছুই পাইনি।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সরকার পাস করেছে। শ্রমিকদের আপত্তির কারণে আইনটি এখন সংশোধনীর অবস্থায় রয়েছে। অথচ আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ প্রশাসনকে। পুলিশের কেউ কেউ এখন চালকদের নির্যাতন ও মামলাবাণিজ্যে অতিউৎসাহী হয়ে উঠছে। দেশে এই পরিবহন চালকদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এ ছাড়া চালক-মালিক, হুড মিস্ত্রি, বডি মিস্ত্রি, ইঞ্জিন মিস্ত্রি, লেদ মিস্ত্রি, ব্যবসায়ী-কর্মচারী মিলে ৬০-৭০ লাখ মানুষ এ পেশার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। এ ছাড়া প্রতিদিন সারাদেশে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি যাত্রী পরিবহনে দিন-রাত সেবা দিয়ে থাকে অটোরিকশা। বিশেষ করে অসুস্থ, বৃদ্ধ, নারী-শিশুদের পরিবহনে সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে অটোরিকশার বিকল্প নেই। শহর-গ্রামে ডোর টু ডোর সেবার মাধ্যমে 'গরিবের অ্যাম্বুলেন্স' নামে খ্যাত হয়েছে অটোরিকশা (থ্রি-হুইলার)। প্রশ্ন হচ্ছে, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধ হওয়ায় গাড়ি দুর্ঘটনা কি কমেছে? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছোট গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১৫-২০ শতাংশ দায়ী।
অটোরিকশা হালকাযান শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি। এ পরিবহন একটি সেবামূলক শিল্প। স্বাভাবিকভাবে এ শিল্পে কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিকই সেবক। এ শ্রমিকরা প্রতিদিন নানা সমস্যার সম্মুখীন। এ শিল্পের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। শ্রমিকদের প্রত্যাশা বিবেচনা করে সরকার তা মেনে নেবে বলে বিশ্বাস।
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অটোরিকশা হালকাযান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন
batwfbd@gmail.com