সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বলতে আমরা বিভিন্ন সম্প্রদায়, বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের মধ্যকার পারস্পরিক সুসম্পর্ককে বুঝি। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদ্দেশ্য।
সামাজিক জীব হিসেবে জীবন যাপন করতে গিয়ে মানুষকে নিজ ধর্ম পালনের পাশাপাশি পার্থিব বিষয়ে ভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক রাখতে হয়। প্রতিবেশী ও সহকর্মী হিসেবে কিংবা ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো লেনদেনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। এসব করতে গিয়ে ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় না রাখলে জীবন যাপন কঠিন হয়ে পড়বে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকবে। ফলে স্বাভাবিক জীবন যাপনের পাশাপাশি নিজ ধর্মকর্ম পালনেও বাধাগ্রস্ত হতে হবে।
সুতরাং প্রত্যেকের শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বার্থেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা অপরিহার্য।
এ জন্য ইসলাম ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে নিষেধ করেনি। বরং তাদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করার তাগিদ দিয়েছে। সুরাহ মুমতাহিনায় আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তোমাদের সেসব লোকের সঙ্গে সদয় হতে ও ন্যায়ানুগ আচরণ করতে নিষেধ করেন না, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়নি এবং তোমাদের তোমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি (আয়াত, ৮)।'
সুরাহ মায়েদার ৮ নম্বর আয়াতে ইমানদারদের বলা হচ্ছে, 'কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব যেন তোমাদের অবিচারে উদ্বুদ্ধ না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী আমল।'
সুরা বাকারাহর ২৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'ভ্রান্তি থেকে যখন সুপথকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তখন আর দ্বীন-ধর্ম নিয়ে কোনো জোরজবরদস্তি চলবে না।' অর্থাৎ যার ইচ্ছা সে সুপথ অবলম্বন করবে, আর যার ইচ্ছা সে বিপরীত পথ অবলম্বন করবে; কাউকে কোনো ধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করা যাবে না।
একটি হাদিসে রাসুল (সা.) কঠিন ভাষায় সতর্ক করে বলেন, 'সাবধান! যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করবে, তার প্রাপ্য কম দেবে কিংবা তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কেয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে বাদী হবো!' (আবু দাউদ -৩০৫২)।
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো চুক্তিবদ্ধ লোককে হত্যা করবে, তার ভাগ্যে জান্নাতের সুঘ্রাণও জুটবে না! অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ ৪০ বছরের পথের দূরত্ব থেকে লাভ করা যায়'। (বুখারি)
সুতরাং কোনো মুসলিম যদি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিমের ওপর আক্রমণ করে কিংবা তার কোনো ক্ষতি সাধন করে, তাহলে সে অবশ্যই কোরআন-হাদিসের বিধান লঙ্ঘন করল।
এভাবেই ইসলাম পরধর্মের লোকদের প্রতি সহনশীল ও সদয় হওয়ার তাগিদ দিয়েছে। সুতরাং আমাদের উচিত কোরআন-সুন্নাহর এসব নির্দেশনা মেনে চলা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলমানদের এ ব্যাপারে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এখানে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কোনো কোনো কুচক্রী মহল ধর্ম অবমাননার মাধ্যমে মুসলিমদের উস্কে দিয়ে ধর্মীয় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তৎপর। তাই কোথাও ধর্ম অবমাননার মতো কিছু ঘটলে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও উগ্র স্লোগান পরিহার করে সহনশীলতা অবলম্বন করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকারের কাছে এর প্রতিকার চাইতে হবে। বিশৃঙ্খলভাবে রাস্তায় নেমে যাওয়ার রীতি থেকে সরে আসতে হবে। যেহেতু আমরা জানি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সেহেতু ষড়যন্ত্রকারীরা যেন সফল হতে না পারে, এ জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়ার আগেই অনুমান করে কাউকে দায়ী করা যাবে না। কোরআন-হাদিসে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বারবার নিষেধ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই না করে কোনো ঘটনার জন্য কোনো সম্প্রদায়কে আঘাত করতে নিষেধ করা হয়েছে, যেন পরবর্তীকালে লজ্জিত হতে না হয়। সুরা হুজুরাতেও বিষয়টি এসেছে।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ব্যাপারে অমুসলিমদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। মক্কার মুশরিকরা রাসুলের (সা.) কাছে আল্লাহর ইবাদত এবং মূর্তিপূজার মধ্যে ভাগাভাগি করার প্রস্তাব করেছিল। আল্লাহ সুরা কাফিরুন নাজিল করে তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, 'তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আর আমার ধর্ম আমার জন্য।' অর্থাৎ সম্প্রীতির নামে মিশ্র ধর্ম পালন করা যাবে না। আমরা অল্প কথায় বলতে পারি, ধর্মীয় সম্প্রীতি হচ্ছে ভিন্ন ধর্মের লোকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, তাদের প্রতি অবিচার না করা, তাদের অধিকার আদায় করে দেওয়া, বিচার-আচার, ব্যবসা, লেনদেন ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ না করা। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাদের সামনে আমাদের ধর্মীয় মাহাত্ম্য তুলে ধরতে হবে।
প্রভাষক, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী