ফেনীর মালবিকা মজুমদারের আত্মীয়স্বজন বাড়িঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। পাওয়ারই কথা। অনেক এলাকাতেই হিন্দুদের রাত জেগে নিজ নিজ বাড়িঘর, দোকানপাট পাহারা দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মালবিকা মজুমদার বিবিসিকে বলেছেন, 'আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে, দেশ ছাড়ার কথা ভাবতাম না। কিন্তু এখন সেটা প্রথম চিন্তা হয়ে গেছে।' ঢাকায় কর্মরত রংপুরের এক আতঙ্কিত হিন্দু বন্ধু মা-বাবা রেখে ঢাকায় আসতে আসতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, 'এখন রংপুর জ্বলছে। কী করব? বাড়িতে বাপ-মা। শ্বশুরবাড়িতে বউ-বাচ্চাসহ সে বাড়ির সবাই। পীরগঞ্জ আমাদের এলাকা থেকে অনেকখানি দূরে। কিন্তু নোয়াখালী থেকে কাছেও নয়।' আমার দীর্ঘদিনের পরম ভাই অপূর্ব রায়। রাজশাহীতে থাকেন। এসব খবর শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বুকে ব্যথা করতে শুরু করে তার। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ভয় কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা কেবল আক্রান্তজনই জানে।
চৌমুহনী, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, উলিপুর, পীরগঞ্জ আচমকাই আক্রান্ত হলো- এমন কথা বলা যায় না। দ্বিজাতিতত্ত্বের ঘটনাপ্রবাহের দুর্ভাগ্যজনক ধারাবাহিকতা মাত্র। এমন নয় যে, সংখ্যালঘু হিসেবে কেবল হিন্দুদেরই আক্ষেপ করতে হয় এক বাঙালি জাতির বাংলাদেশে। রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বুকের ক্ষত আজও শুকায়নি। নাসিরনগরের বিলাপ কোথাও মিলিয়ে যায়নি। গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের মধ্যে অনেকেই বেঁচে আছেন বিকলাঙ্গ হয়ে। বুড়িমারীতে হাজারো মানুষের ইমানি আগুনে জীবন্ত ছাই হয়ে যাওয়া রংপুরের শহীদুন্নবী জুয়েলের মৃত্যুচিৎকার এখনও রংপুর-লালমনিরহাটের বাতাসে কান পাতলে শোনা যায়। নওগাঁর আলফ্রেড সরেন হত্যাকাণ্ডের বিচার ২১ বছরেও হয়নি। সব ঘটনা মনে করাও কম আতঙ্কের নয়! সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নারীদের ধর্ষণ, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, জমি-ভিটা দখল করা ইত্যাদি ঘটনায় চিহ্নিত দায়ী ব্যক্তি, গোষ্ঠী- কারও বিচারিক শাস্তি হওয়ার নজির আমাদের সামনে নেই। সুতরাং অচিহ্নিত সামষ্টিক অপরাধী গোষ্ঠীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশা নাগরিক সমাজ থেকে বিলুপ্ত হওয়া অস্বাভাবিক কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক পতন নয়। সমাজের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ হতাশা ও আস্থাহীনতার বিষণ্ণ সুর নিঃশব্দে গোঙাচ্ছে। কেউ না শুনলেও বেদনা মিথ্যা হয়ে যায় না।
মালবিকা মজুমদারের দেশ ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা 'প্রথম চিন্তা' হয়ে ওঠে কেন? এ দেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানের সন্তানরা কি দেশ ছেড়ে যায় না? কেউ পড়তে গিয়ে আর ফেরে না। কেউ এ দেশকে বসবাসের অনুপযুক্ত বিবেচনা করে চলে যায়। কেউ যায় প্রাণ বাঁচাতে। ফলে, শুধু সংখ্যালঘুদের ভয়ই শেষ কথা নয়। ধর্ম রক্ষার নামে বধ করা হয়েছে একের পর এক ভিন্নমতাবলম্বীদের। ধীরে ধীরে ভয়,আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ নিজেরাই হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে মতপ্রকাশের সার্বিক স্বতঃস্ম্ফূর্ততা। অথচ আধিপত্যবাদী তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালি রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছিল সাম্যের স্বপ্টম্নসমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। সেই দেশের সংবিধানে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়া 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' কি এ দেশের জনমানসের পরিচর্যায় কোনো ভূমিকাই রাখেনি? অবশ্যই রেখেছে। আমাদের শিক্ষা কারিকুলামের অসহায় ধর্মমুখী বিবর্তন, নারীর বিরুদ্ধে মাওলানাদের জ্বালাময়ী ওয়াজ, শিক্ষার নানা রকমফেরের কি কোনোই প্রভাব পড়েনি সুবিস্তৃত ও সূক্ষ্ণ হতে থাকা ধর্মীয় অনুভূতি গঠনে? বিপরীতে, সংবিধানের মূলনীতিগুলো জনমনে প্রোথিত করার কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি কি কোনো সরকারের তরফে নেওয়া হয়েছে? আমাদের চিরায়ত পরিবেশনানির্ভর জনপ্রিয় সংস্কৃতিচর্চার পথে পথে আমরা কাঠামোগতভাবে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছি। করোনা মহামারির আবির্ভাবে এই ভয়াবহ প্রক্রিয়া স্ম্ফূর্তি লাভ করেছে। এখানে যাত্রাশিল্পী, পালাকার, পুঁথিকারদের এখন রিকশা চালাতে হয়, দিনমজুরি করতে হয়। এখানে গান গাওয়ার অপরাধে সমাজপতিরা বাউলদের মাথা ন্যাড়া করে দিয়ে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে। রাষ্ট্র চেয়ে চেয়ে দেখে। সংগীতের মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই শিল্পীকে জেলে যেতে হয়। অথচ ধর্ষকরা এখানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। ঘুষখোর, চাঁদাবাজরা দাপটের সঙ্গে চলে, ভিআইপি মর্যাদা লাভ করে। প্রবল ধর্মানুভূতি তাতে আহত হয় না। এসব বহুমাত্রিক বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চয় চাঙ্গা রাখা যায় পুঁজিকেন্দ্রিক ব্যবস্থায়; সমাজকে সংহত রাখা যায় না, মানুষের শান্তি ও জীবনের অধিকার রক্ষা করা যায় না। শান্তি ও সম্প্রীতিই যদি না রইল, তো কী মূল্য হয় মরণশীল মানুষের কল্যাণে সৃষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার?
আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড়ই পরিতাপ জাগায়। কুমিল্লা, নেয়াখালীর ঘটনার পরও জাঁকজমকপূর্ণ প্রশাসনিক সতর্কতার মধ্যে উলিপুরের গুনাইগাছ, থেতরাই ও হাতিয়ায় কীভাবে মন্দিরের পর মন্দির ভাঙা সম্ভব হলো! সামষ্টিক সহিংসতা কি গোপনে ঘটানো যায়? পীরগঞ্জে সবার চোখের সামনে দিয়ে ধর্মের সৈনিকরা হিন্দুদের পাড়া জ্বালিয়ে দিতে পারল তো অনায়াসেই! শেষ করে দিতে পারল নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সর্বস্ব! কীভাবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এই সামষ্টিক দুর্বৃত্ত চক্র!
আসলে আইন ও শক্তি দিয়ে কি অপবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িক হিংসা, দুর্বলের ওপর সবলের সহিংস বেটাগিরি বন্ধ করা সম্ভব? না। সম্ভব নয়। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে উপযুক্ত করে তুলতে হবে। সম্প্রীতির মূল্যবোধসম্পন্ন সামাজিক শিক্ষার অব্যাহত কর্মসূচি জারি রাখতে হবে। সাংবিধানিক সমাজ বাস্তবায়ন করতে হলে সহিষ্ণুতার শিক্ষা বিস্তারের শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণ করা এই রাষ্ট্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সমাজের সর্বস্তরে বাড়াতে হবে সম্প্রীতির উপাদান- শিশু ও তরুণদের খেলাধুলার সব সুযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে মুক্তমন বিকাশের সব পথ, মানুষে মানুষে মিথস্ট্ক্রিয়া ঘটানোর উপযুক্ত পরিবেশ। হতে দিতে হবে মেলা, উৎসব ও সম্মিলনের মিছিল। মডেল মসজিদের পাশাপাশি থাকতে হবে মডেল পাঠাগার ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। বন্ধ করতে হবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্মভীরু মানুষকে ধর্মের নামে অপগল্প শোনানোর চক্রাকার আনুষ্ঠানিকতা। থামিয়ে দিতে হবে শ্রেষ্ঠত্ববাদের হুঙ্কার। কেউ শ্রেষ্ঠ ধনে, কেউ পদবিতে, কেউ ধর্মে। শ্রেষ্ঠরা সর্বক্ষেত্রে নিকৃষ্টদের ধ্বংস করতে চায়। এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল সবার দেশ হয়ে ওঠার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো শুনলে তা বারবার উপলব্ধি করা যায়। তার কন্যার নেতৃত্বের কাছে তাই আমাদের প্রত্যাশা প্রবল। সম্প্রীতিময় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে উদাহরণ হয়ে উঠুক। ফিরে আসুক বাহাত্তরের সংবিধান পুরোপুরিভাবে।
গল্পকার ও অনুবাদক