বাজারে আবারও সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি এবং তা লিটারপ্রতি সাত টাকা কোনোভাবেই সাহিত্যের বিষয় নয়, আমরা জানি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য যেমন বাড়িতে তেমনই বাজারে এ দাম বৃদ্ধি সংকট তৈরি করবে। আর বাংলাদেশে কোনো একটি পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে যে আর কমে না- তাও আমরা জানি। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও সমাজে দেখা গেছে, যখন কঠিন বাস্তবতা ক্রমেই অনিবার্য হয়ে ওঠে; যখন নাগরিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তারা করুণ রসের বদলে হাস্যরসের আশ্রয় গ্রহণ করে। এক সয়াবিন তেলের দাম যখন প্রায় প্রতি মাসেই বাড়তে থাকে; যখন এক বছরে কমবেশি ৫০ শতাংশ দাম বা,ে; তখন বাজার নিয়ে সংকট বিষয়ে আলোচনার বদলে সাহিত্যই কি শ্রেয়তর নয়? বলা বাহুল্য, শুধু ভোজ্যতেল নয়; কৃষিজাত কোনো পণ্যের দাম নিয়ে কথা বলতে গেলে সাহিত্যামোদীদের প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'ফুলের মূল্য' ছোটগল্পের কথা মনে পড়তে পারে।

সাত সাগর পাড়ি দিয়ে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে যুদ্ধ করতে এসে প্রাণ হারানো প্রিয়জনের সমাধিতে একগুচ্ছ ফুল দিতে গল্পের উত্তম পুরুষের হাতে অর্থ গুঁজে দিয়েছিলেন এক বিদেশিনী। প্রবাসী ওই বাঙালি মুখ ফুটে বলতে পারেননি যে, সেই সময় পর্যন্ত উপমহাদেশে ফুল কিনতে পয়সার প্রয়োজন হতো না। এখন অবশ্য ফুলের মূল্য চাল-ডাল-তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চেয়েও বেশি। বাজারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তখন ভারতবর্ষ বা বর্তমান বাংলাদেশে ভোজ্যতেল কিনতেও পয়সার প্রয়োজন হতো না। ক্ষেতের সরিষা থেকে যে তেল তৈরি হতো, তা যেমন প্রসাধনী হিসেবে শরীরে, তেমনই স্নেহবর্ধক হিসেবে খাদ্যে ছিল উপাদেয়। এত উপযোগিতা সত্ত্বেও দাম খুব বেশি ছিল না।

আর মাসে মাসে দূরে থাক, বছর বছরেও তেল উৎপাদক বিশেষ পেশাজীবীদের পক্ষে দাম বাড়ানোর 'দুঃসাহস' করা সম্ভব হয়ে উঠত না। সবকিছুর বাণিজ্যিকীকরণে এখন অবশ্য সরিষার তেল হয়ে উঠেছে আরও মহার্ঘ্য। ওদিকে বিপুল চাহিদা মেটাতে জাহাজে উঠে যে সয়াবিন তেল বাংলাদেশে এসে নেমেছিল, প্রথমদিকে তার দাম কম থাকলেও এখন বেড়েই চলেছে। মাঝখান থেকে 'প্রিয়' তেল কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের। বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তের কাঁচামাল দিয়ে অপর প্রান্তে যখন পণ্য তৈরি হয়, তখন বাজারের মতিগতি যে শুধু স্থানীয় শর্তের ওপর নির্ভর করে না, আমরা জানি। কিন্তু এই দফায় সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যা ঘটেছে, তা তুঘলক যুগেই মাত্র সম্ভব ছিল।

বুধবার সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ, মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদক সমিতি নতুন দর নির্ধারণের বিষয়টি 'জানিয়ে দিয়েছে'। সংগঠনটির পক্ষে রীতিমতো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে 'দাম বাড়তি' থাকায় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে 'আলোচনা সাপেক্ষে' এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন দুটো- প্রথমত আন্তর্জাতিক বাজারে কি আসলেই দাম বেড়েছে? সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ক্রমাগত কমছে। তাহলে এই দাম বৃদ্ধি কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন আরও গুরুতর। একটি ব্যবসায়িক সংগঠন এসে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কথা বলল আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ কর্তৃপক্ষ তা মেনে নিল! বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা নিশ্চয়ই চাই, মুক্তবাজার ব্যবস্থায় উৎপাদক কিংবা আমদানিকারকরা উপযুক্ত মূল্য পাক; কিন্তু ভোক্তাদের কথাও ভাবতে হবে।

অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের দেশে 'তেল-সংস্কৃতি' যথেষ্ট উৎপাদনশীল। কিন্তু সত্যিকারের তেল ভোক্তাদের জন্য সহজলভ্য করতে হলে এর আমদানি, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থা সংহত করার বিকল্প নেই। ভোজ্যতেলের সংকট নিয়ে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা অনেক দিন ধরেই অরণ্য রোদন করে আসছি। নীতিনির্ধারণী মহলেও এ ব্যাপারে কম আলোচনা হয়নি। এখন সময় এসেছে সক্রিয় হওয়ার। অন্যথায় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের পরিসর ছাপিয়ে 'তেলের মূল্য' নামে অমর কথাসাহিত্য রচিত হতে পারে বটে; তা দিয়ে ভোক্তার রসনা বা মন ভরানো কঠিন।