বাজারদরে অস্থিরতা, দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক শান্তিতে বিঘ্ন এবং ই-কমার্সে 'নষ্ট-ভ্রষ্ট' নানা নেতিবাচক খবরে যখন মন বেশ খারাপ, ঠিক তখনই দেশের বাইরে থেকে বেশ কিছু ইতিবাচক সংবাদে আশ্বস্ত বোধ করছি। এখানে কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড থেকে প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের অসামান্য অগ্রগতির কথা বলি। এই সূচকে গত বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের অগ্রগতি আশপাশের দেশগুলো থেকে ভালো। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২১-এ ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। সূচকের স্কোর একশর মধ্যে হিসাব করা হয়। স্কোর যত কমে, ক্ষুধা সূচকের অগ্রগতি তত বাড়ে। এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ১। নেপালেরও তাই। তবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের স্কোর ঢের ভালো। এ বছর ভারতের অবস্থান ১০১তম, স্কোর ২৭ দশমিক ৫। পাকিস্তানের স্কোর ২৪ দশমিক ৭। ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান গত বছরের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নগামী। গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ৯৪তম; এবার ১০১। পাকিস্তানের গত বছরের অবস্থান ছিল ৮৮তম; এ বছর ৯২। বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ কমলেও স্কোর অগ্রগতি বেশি।

আরেকটু পেছন থেকে যদি বাংলাদেশের স্কোর দেখি তাহলে বুঝতে পারব, বাংলাদেশ ক্ষুধা সূচকে গত এক দশকে কী হারে উন্নতি করছে। ২০১২ সালে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৮ দশমিক ৬। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৪-এ। ২০২১ সালে তা হয়েছে ১৯ দশমিক ১। তার মানে ২০১২ থেকে ২০২১; এই ৯ বছরে সূচকে স্কোর কমেছে ৯ দশমিক ৫। বছরে একের চেয়েও বেশি করে কমেছে স্কোর। আরও খুশির কথা এই যে, বাংলাদেশের সূচকটি 'সিরিয়াস' বা ভয়ংকর থেকে উন্নতি হয়ে 'মডারেট' বা সহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। ভারত ও পাকিস্তান কিন্তু এখনও 'সিরিয়াস' পর্যায়েই রয়ে গেছে। আরও ভালো খবর এই; বিশ্বের যে ১৪টি দেশের ক্ষুধা সূচকের অগ্রগতি গত ৯ বছরে ২৫ শতাংশেরও বেশি, সে ক'টি দেশের একটি বংলাদেশ। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে যখন করোনা সংকটে মানুষ পর্যুদস্ত, তার মধ্যেই ঘটেছে এ অগ্রগতি।

এই অগ্রগতির মানে কী? পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে যদি অপুষ্টির মাত্রা কমে আসে; যদি উচ্চতা ও বয়সের তুলনায় ওজন কম এমন শিশুর অনুপাত কমে আসে এবং শিশুর মৃত্যুহার কমে আসে, তাহলেই এ সূচকের বিচারে একটি দেশের অগ্রগতি হয়। তার মানে শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই সন্তুষ্টির যথেষ্ট কারণ নেই। উৎপাদিত এই খাবারের বণ্টন ব্যবস্থাটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষের ভোগের যে বিন্যাস, তাতে দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যে গড়পড়তা উন্নতির পাশাপাশি শিশুদের ভোগেও গুণগত পরিবর্তন এসেছে। ভারত এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। আমরাও ভারত থেকে চাল-ডাল, পেঁয়াজসহ অনেক খাদ্যপণ্য আমদানি করি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ভোগের বিন্যাস ভারতের চেয়ে ভালো (ক্ষুধা সূচকে অগ্রগতিই তার প্রমাণ)। আর এই ভোগের ইতিবাচক প্রভাব আমাদের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের ওপরেও পড়ছে। করোনার এই সংকটকালসহ গত প্রায় এ দশক ধরে ভোগের পরিমাণ ও স্থিতিশীলতা দুই-ই বাড়ছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপির যে বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি, তার ৬৩ শতাংশই আসে এই ভোগ থেকে। আর ক্ষুধা সূচক বলছে, এই ভোগে শিশুদের ভাগও বাড়ছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলেই সর্বস্তরের নাগরিকদের খাদ্য কেনার সক্ষমতা বেড়েছে। তাই করোনা মহামারি আর মহামারিজনিত অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও আমাদের শিশুদের অপুষ্টির মাত্রা বাড়েনি। সরকারি সমর্থনপুষ্ট 'পুষ্টি আপা'রা যেমন অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের পুষ্টিকর খাবার খেতে উৎসাহিত করেছেন, তেমনি তাদের শিশুদের খাদ্য তালিকাতেও দেশজ পুষ্টিমানের খাদ্য যুক্ত করতে তথ্য সরবরাহ করে গেছেন। একই ভূমিকা পালন করেছে অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশনসহ প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোও খাদ্যের পুষ্টিমান বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজবোধ্যভাবে সংকলিত করা হয়েছে। সব মিলে শিশুদের অপুষ্টির মাত্রা হ্রাস এবং শিশুমৃত্যু ঠেকানোর নানামুখী উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার সুফলই আমরা এখন পেতে শুরু করেছি।

একদিকে আধুনিকায়ন ও বহুমাত্রিকীকরণের ফলে টেকসইভাবে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মানুষের আয় বাড়ায় তাদের পক্ষে এই কৃষিপণ্য ক্রয় করাও সম্ভব হচ্ছে। গ্রাম থেকে কোটিখানেক মানুষ কাজের সন্ধানে প্রবাসে গেছেন। পাশাপাশি অর্ধকোটি গ্রামীণ নারী-পুরুষ গার্মেন্টসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানায় যুক্ত। এর দ্বিমুখী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রথমত গ্রামাঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের সরবরাহ কমায় কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের পরও কৃষি শ্রমের মূল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। ফলে এখন কৃষিতে নিযুক্ত দিনমজুরের পক্ষে তার আয় থেকে চাল কেনার পাশাপাশি মাছ-মাংস, ডাল, সবজি কেনার পরও সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে। সঞ্চিত ওই অর্থে জীবনমান উন্নয়নে ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসে বা শহরে কাজে যাওয়া নারী-পুরুষরা গ্রামে যে টাকা পাঠাচ্ছেন, তার ফলে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ভোগ ও সঞ্চয় দুই-ই বাড়ছে। বড় কথা, মোবাইলভিত্তিক লেনদেনের সর্বজনীন সুযোগের ফলে গ্রামে অর্থ প্রবাহ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা দুই-ই বাড়ছে। একই কথা প্রযোজ্য এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রেও। শুধু টাকা পাঠানো সহজ হয়েছে, তা নয়। এখন ডিজিটালি টাকা জমানোর সুযোগও বহুলাংশে বেড়েছে। যেমনটি আগেই লিখেছি; সঞ্চিত অর্থ প্রান্তিক পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই আয় বৈষম্য বাড়লেও, ভোগ বৈষম্য অতটা বাড়েনি। বৈষম্যের জিনি-সহগ ভোগের বেলায় দশমিক ৩৫-এর আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ চেইনে অসংগতি, চাঁদাবাজি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতার ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্টম্ফীতি বেড়েছে। এতে দরিদ্র পরিবারগুলো চাপে পড়েছে। আশা করছি, প্রত্যাশিত গতিতে পরিকল্পনা অনুসারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা যাবে। এর ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যকার বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা কাটবে। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও মূল্যস্টম্ফীতিকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট রেগুলেটরি টুল্‌স রয়েছে।

সবকিছুর পরও দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে আরও টেকসই করতে সরকার এবং ব্যক্তি খাতকে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে লবণাক্ততা এবং চরে বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে কৃষি উৎপাদন যে ব্যাহত হয়, সে কথা আমরা জানি। সরকার সে কারণে কৃষিবিজ্ঞানীদের লবণাক্ততা-সহিষুষ্ণ কিংবা হাওরে শীত-সহিষুষ্ণ বীজ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট গবেষণা তহবিল দিচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ নিয়ে গবেষণা করছে। ব্যক্তি খাতও কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটের যে ৮ শতাংশ এখন ৩০টি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়; সেখান থেকে আরও বেশি বরাদ্দ কৃষি মন্ত্রণালয়কে দিলে তারা সবুজ কৃষির উন্নয়নে আরও বেশি করে গবেষণা ও উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারবে।

আগামী দিনের কৃষিকে হতে হবে সবুজ এবং আরও বেশি উৎপাদনশীল। তাই কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বেই। প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার, সবুজ সেচ, সবুজ সারসহ ই-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। বাড়বে নগর কৃষির আওতায় ছাদ-বাগানের সংখ্যা। এর সঙ্গে নতুন শিক্ষিত কৃষি উদ্যোক্তার সংখ্যাও বাড়বে। তাদের প্রস্তুত করার দায়িত্ব আমাদের শিক্ষালয়কে নিতে হবে। কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির জন্য উপযুক্ত দক্ষতা প্রদান, প্রাথমিক পুঁজি (স্টার্ট-আপ পুঁজি) প্রদান, সংরক্ষণ ও মার্কেটিং অবকাঠামো গড়তে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তেমনি ব্যক্তি খাতের বড় উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামে এনজিওগুলোকেও কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচশ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ তহবিল তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলোকে বলেছে, তারাও যেন সবাই অনুরূপ তহবিল তৈরি করে নতুন উদ্যোক্তা গড়তে সাহায্য করে। এই তহবিলের একটি অংশ যেন তরুণ শিক্ষিত কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়, সেদিকটা নিশ্চয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে পারে।

এসব নীতি মনোযোগ সবাই মিলে দিলে নিশ্চয় নতুন যুগের নতুন কৃষির প্রসারে গতি আসবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে। তবে উৎপাদন বাড়লেই ক্ষুধা কমবে, এমনটি বলা ঠিক হবে না। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলায় যত দুর্ভিক্ষ হয়েছে তাতে খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি ছিল না। ঘাটতি ছিল কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারে। ঘাটতি ছিল মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতায়। বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব ও গরিব-হিতৈষী নীতি মনোযোগের কারণে এখন মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা অনেকটাই বেড়েছে। জলবায়ুবান্ধব বহুমাত্রিক কৃষির কদর বাড়ছে। সরকারি বিনিয়োগও বাড়ছে। এই নীতি মনোযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি কৃষি সম্প্রসারণসহ উপযুক্ত তথ্যাভিযান অব্যাহত থাকলে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের উত্তরোত্তর অগ্রগতি হবেই।

প্রকৃতির দান ও মানুষের জ্ঞান; দুইয়ে মিলেই বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হোক। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর হোক। বাড়ন্ত কৃষি ছাড়াও রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের গতিমাত্রার কারণে এই সংকটকালেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। তবে মূল্যস্টম্ফীতির বাড়ন্ত রূপ সাধারণ মানুষকে বেশ খানিকটা বিপাকেই ফেলেছে। এর পেছনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণগুলো বিশ্নেষণ করে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিচক্ষণ নীতি গ্রহণ করবে; আমরা সে প্রত্যাশাই করছি। সমাজে শান্তি বিরাজ করুক এবং সবাই মিলে সম্প্রীতির পরিবেশে আয়-রোজগার করে ভালোভাবে বেঁচে থাকি- সে প্রত্যাশাই করি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর