কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি গবেষক ও সমান্তরালে কৃষকের অবদান বরাবরই গভীর মূল্যায়নের দাবি রাখে। দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার আলো যাদের কল্যাণে ছড়াচ্ছে; এর অংশীজন সবাইকে আমাদের অভিনন্দন। বন্যাসহিষ্ণু ধানের উদ্ভাবন কৃষি খাতে সাফল্যের আরও একটি পালক যুক্ত করেছে। শুক্রবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বন্যাসহনশীল বিনা-১১ ধান চাষ করে হাসি ফুটেছে চরাঞ্চলের কৃষকের মুখে। এ ধানের যেমন ফলন বেশি, তেমনি ২৫ দিন পানিতে ডুবে থাকলেও এর কোনো ক্ষতি হয় না। আবার উৎপাদন খরচও অন্য ধানের চেয়ে অর্ধেক। আরও আশার কথা, ১১০ দিনে এ ধানের ফলন হওয়ায় জমিতে বছরে অন্তত তিনটি ফসল ফলানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ময়মনসিংহের চরাঞ্চলে নদীর পানি কিংবা বন্যা-বৃষ্টিতে যে সোনালি ধান তলিয়ে যেত, সেখানে এখন কৃষকের বুকভরা আশা।

আমরা জানি, আমাদের ভাটি বাংলার বিস্তীর্ণ হাওরে বৃষ্টি, বন্যা কিংবা নদীর পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে কৃষকের পাঁজর ভেঙে যায়। আঘাত লাগে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এই দেশে নানা দিকে। ভাটি বাংলায় সাধারণত এক ফসলই (বোরো) চাষাবাদ হয়। সেখানে বিনা-১১ চাষাবাদের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। আমরা মনে করি, নদীতীরের চরাঞ্চলের মানুষের হাসি বিনা-১১ ধান চাষ দেশের অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগ উদ্যোগ নিলে এর সুফল হবে বহুমুখী। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণে ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের কৃষকরা নিজেরাই এখন বীজ উৎপাদন পদ্ধতি আয়ত্ত করে নিয়েছেন।

উত্তরের বিভিন্ন জনপদ, বরেন্দ্র ভূমি, গোপালগঞ্জসহ আরও কয়েকটি কৃষিপ্রধান অঞ্চলে বন্যাসহিষ্ণু, উচ্চ ফলনশীল বিনা-১১ ধান চাষাবাদ হয়েছে কয়েক হাজার হেক্টরে। আমরা জানি, নিকট অতীতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্পকালীন আমন ও আউশ ধানের চারটি নতুন জাত উদ্ভাবন করে দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আমাদের এও স্মরণে আছে, খরা, লবণাক্ততা ও শীতসহিষ্ণু প্রজাতির ধান উদ্ভাবনের পাশাপাশি সম্ভব হয়েছিল পুষ্টি উপাদান দস্তাযুক্ত ধানের জাত উদ্ভাবনও।

আমরা জানি, আমাদের কৃষকরা দীর্ঘকাল ধরে শত শত ধানের জাত আগলে রেখেছিলেন। তাদের অর্জন ব্যাপৃত করতে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্যের জাত ও প্রজাতি উদ্ভাবনে পরবর্তীকালে কৃষকদের নিরলস প্রচেষ্টার সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের ভূমিকা আজ দেশে দৃশ্যমান। যদিও উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষাবাদ ব্যবস্থায় রাসায়নিকের ব্যবহার, কৃষকের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে কিছু বিতর্ক আছে। কিন্তু আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মোকাবিলায় এর প্রয়োজনীতা এড়ানোর উপায় নেই।

আমরা মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রেক্ষাপটসহ আরও কিছু কারণে অঞ্চলভেদে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাতের ধান উদ্ভাবনের বিকল্প নেই। তবে পরিবেশ সুরক্ষাসহ যেসব গঠনমূলক সমালোচনা ও সতর্কতার কথা উঠে এসেছে পরিবেশবাদীদের তরফে, তাও আমলে রাখা প্রয়োজন। কৃষিতে উদ্ভাবনের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হোক, আমরা অবশ্যই তা চাই। আমাদের লোকায়ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি যাতে স্বার্থ উদ্ধার করতে না পারে; নজর রাখতে হবে সেদিকেও। হরিপদ কাপালীর 'হরিধান' কিংবা লেবুয়াত শেখ উদ্ভাবিত 'লেবুয়াত ধান'-এর উদ্ভাবন লোকায়ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞারই ফল।

তাদের অবদানের আলো ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কৃষিক্ষেত্রে এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় এনেছে বিস্ময়কর পরিবর্তন। বাংলার কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টা হোক আরও গতিশীল। আমরা জানি, জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কমছে আবাদি জমি। আবাদি জমি রক্ষা করতেই হবে; একই সঙ্গে ফলনযোগ্য কোনো জমিই যাতে অনাবাদি না থাকে; নজর বাড়াতে হবে সেদিকেও।