জাতি হিসেবে আমাদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো কৃতকর্মের দায় আমরা কেউই নিতে চাই না। যখন কোনো কাজ বা ঘটনার দায় নিজের ওপর চাপার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখনই সামনে যাকে পাওয়া যায় তার ওপর দোষ চাপিয়ে নিজে দায়মুক্ত হতে চাই। সে সময় এটা চিন্তা করে দেখি না যে, আমি যার ওপর দায় চাপাচ্ছি, সে আসলে ওই ঘটনার জন্য কতটুকু দায়ী বা আদৌ দায়ী কিনা। বলাটা অসংগত নয়, আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে এ প্রবণতা প্রকট। তারা কোনো বিশেষ ঘটনার জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করতে সিদ্ধহস্ত। অভিযোগের তীরটা ছুড়ে দিয়েই তারা খালাস। সে তীর লক্ষ্য ভেদ করবে কিনা, তা ভেবে দেখার ফুরসত তারা পান না।

বর্তমানে দেশের গরম খবর হলো, পেঁয়াজের বাজার গরম। গত দুই সপ্তাহ যাবৎ পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় বইছে। সাধারণত কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া হঠাৎ পণ্যমূল্য বেড়ে গেলে সবাই বাজার সিন্ডিকেটকেই এতদিন দায়ী করতেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সরকারের মন্ত্রীরাও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকানোর ব্যর্থতাকে সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে চালিয়ে দেন। আমাদের কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এবার পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির দায় সরাসরি জনসংখ্যা তথা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, 'দেশে প্রতি বছর ২৪ লাখ মানুষ বাড়ছে। জনসংখ্যার এই আধিক্যের কারণে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।' (সূত্র ১৬ অক্টোবরের পত্রিকা)। বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাক্কালে গত ১৫ অক্টোবর রাজধানীর খামারবাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছেন।

পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির কৈফিয়ত হিসেবে কথাগুলো কিন্তু যুক্তিহীন নয়। সত্যিই তো! প্রতি বছর ২৪ লাখ নতুন মুখ খাবারের সঙ্গে পেঁয়াজও গিলে চলেছে। এই বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য যদি উৎপাদন বাড়ানো না যায়, তাহলে সংকট তো হবেই। সুতরাং 'মন্ত্রী বচন অমৃতসম' বলে মেনে নেওয়াই বোধ করি ভালো। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ার চাপ কি শুধু পেঁয়াজের ওপরেই পড়ে? চাল-ডাল-তেলসহ অন্যান্য দ্রব্যের দামও ফি-বছর কিছু না কিছু বাড়ে। কিন্তু সেগুলো পেঁয়াজের মতো বছরের বিশেষ একটা সময়ে হনুমানের মতো লাফিয়ে মগডালে চড়ে বসে না। সুতরাং এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে যে অন্য অনেক গুরুতর কারণ রয়েছে; মন্ত্রী মহোদয় হয়তো সেটা ভেবে দেখেননি। তবে অভিযোগ অনেকটাই নিরাপদ। কেননা, অভিযুক্তদের ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্ন হয়তো তুলবে না। তিনি যদি এ জন্য বাজার সিন্ডিকেটকে দায়ী করতেন, তাহলে প্রশ্ন উঠত, সে সিন্ডিকেটকে তারা দমন করতে পারেন না কেন? ফি বছর কেন ওই বাজার সিন্ডিকেট পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি, চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে নিজেরা অবৈধ মুনাফা লুটবে, আর জনগণের নাভিশ্বাস ওঠাবে?

সিন্ডিকেট শব্দটি আমাদের কাছে এখন অপরিচিত নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিচিত। সরকারের যে কোনো ব্যর্থতার দায়ভার ওই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সংশ্নিষ্টরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চান। কিন্তু তারা এটা ভুলে যান যে, অপরাধ যদি অশরীরী কোনো সিন্ডিকেট ঘটায়ও, তার পেছনে রক্ত-মাংসের মানুষদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সরকারেরই দায়িত্ব। সে দায়িত্ব তারা কতটুকু পালন করছেন বা করতে পারছেন- সে প্রশ্ন তোলা নিশ্চয় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হবে না।

পেঁয়াজ নিয়ে প্রতি বছর এ সময়ে প্যাঁচঘোচ লাগে। সবারই মনে থাকার কথা; দু'বছর আগে ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ এক মাসের মধ্যে উঠে গিয়েছিল ৩০০ টাকা কেজিতে। পেঁয়াজের মূল্যঝাঁজ জনগণের নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলেছিল। দাবি উঠেছিল এর পেছনের হোতাদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করার। কয়েক দিন বেশ হম্বিতম্বি শোনা গিয়েছিল। তারপর সব সুনসান। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, পেঁয়াজ আর ৩০ টাকায় নেমে আসেনি। প্রমোশন পেয়ে উচ্চাসনে যাওয়ার পর বোধ করি তার আভিজাত্য বেড়েছে। তাই ৪৫ পর্যন্ত নেমেই সে তার অধোগতি রোধ করে বসে আছে। সেই ৪৫ টাকার পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। কারও কারও আশঙ্কা, পেঁয়াজ তার মূল্যের রেকর্ড আবার ভাঙে কিনা।

আমাদের দেশে এই সময়টায়, অর্থাৎ আশ্বিন-কার্তিক মাসে পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়ে। নতুন পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত দাম কমে না। এটা যেহেতু সাংবৎসরিক ঘটনা, তাই এর মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি পূর্বাহেপ্তই নেওয়া কি বাঞ্ছনীয় ছিল না? সরকারের কাছে কি আমাদের দেশীয় পেঁয়াজের উৎপাদন আর চাহিদার সঠিক পরিসংখ্যান নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে চাহিদার ঘাটতি মেটাতে আগেভাগে কেন উদ্যোগ নেওয়া হলো না? নাকি এখানেও 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়' জাতীয় বিষয় লুকিয়ে আছে? না, আমাদের মতো আম-পাবলিকের পক্ষে অত সব খবর রাখা সম্ভব নয়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি দ্রব্যচাহিদা বাড়ার একটি কারণ অবশ্যই। সে কারণে দাম বাড়াও অস্বাভাবিক নয়। তবে ওটাই একমাত্র কারণ হতে পারে না। এর পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। সে কারণগুলো অনুসন্ধান করে সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়াই দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব। তা না করে বায়বীয় অভিযোগ ছুড়ে দেওয়া দায়িত্ব এড়ানোর স্থূল কৌশল মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের দায়িত্ববানরা সে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম কি?

সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক