ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রগামী দেশগুলোতে যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থনৈতিক জাগরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এ নিয়ে কী ভাবছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর দিকে চোখ ফেরানো যেতে পারে। কাকতালীয়ভাবে জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা, স্কুল অব ফিউচার প্রতিষ্ঠা এবং আইসিটি নীতিমালা-২০১৮ সংশোধন- এ তিনটি উদ্যোগই সরকার গ্রহণ করেছে সাম্প্রতিক সময়ে। আর এসব উদ্যোগের মধ্যেই নিহিত কিছু অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তবে এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অভিন্ন লক্ষ্যটি হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের বিকাশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। বর্তমান বিশ্বে যে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি হচ্ছে, তার মূলেও রয়েছে এই তিন উপাদান, যা বিশ্বে মেধানির্ভর অর্থনীতির অভিযাত্রাকে দ্রুততর করছে। এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের ৪৫ লাখ পোশাক শ্রমিক অবদান রাখছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানিতে। আর আসিয়ান জাতিগুলোয় ২৫ লাখ তথ্যপ্রযুক্তি শ্রমিক অবদান রাখছে ৩৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানিতে, যা প্রায় ২০ গুণ। চতুর্থ বিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), রোবোটিকস, ব্লকচেইন, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা যোগ হয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগুণ।

এ নিবন্ধে সরকারের আলোচ্য তিনটি উদ্যোগ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ও দক্ষ মানবসম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে বৃদ্ধিবৃত্তিক অর্থনৈতিক জাগরণ সৃষ্টিতে কতটা সহায়ক, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, অতীতেও বিজ্ঞান, কারিগরি, প্রযুক্তির প্রসারসহ যুগের চাহিদা অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ক্ষমতার পালাবদলে তা বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগের কথাই ধরা যাক। সম্প্রতি বহু প্রত্যাশিত এ জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখার খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বহু প্রত্যাশিত বলছি এ জন্য যে, স্বাধীনতার আগে ও পরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রথম উদ্যোগটি নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের নবজীবন সৃষ্টির চাবিকাঠি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। তিনি বলেছিলেন, 'আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে, যার দ্বারা চরিত্রবান, কর্মঠ ও দক্ষ মানুষ সৃষ্টি করা যায়।' (১৫ মার্চ, ১৯৭৩)। তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশনকে দিয়ে রিপোর্ট করিয়েছিলেন, তাতে দেশের মানুষ ও যুবক শ্রেণির চাকরি ও কাজের ব্যবস্থার জন্য প্রয়োগমুখী, কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে একে আলাদা অধ্যায় হিসেবে সন্নিবেশিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল করা হয়। এর পর ছয়টি শিক্ষানীতি বা প্রতিবেদন প্রণীত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার 'শিক্ষানীতি ২০০০' প্রণয়ন করলেও ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের ফলে তা বাস্তবায়নের পরিবর্তে বাতিল করা হয়। 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০'-এর বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান থাকলেও এর ব্যাপক সংস্কারের দাবি উঠেছে। কারণ এ শিক্ষানীতিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে শিক্ষালাভ ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আবির্ভাব নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ক্লস শোয়াবের 'চতুর্থ শিল্পবিপ্লব' গ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে। এমনি প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে দেশের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের কাছে সমাদৃত। তবে এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এমন কথাও তারা বলছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় আইসিটি শিক্ষার পরিবর্তে ডিজিটাল টেকনোলজি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এর ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকেই শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ে হাতে-কলমে ধারণা পাবে এবং শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা বা ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্য হয়ে উঠবে এবং বৃদ্ধিবৃত্তিক অর্থনৈতিক জাগরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের অন্যতম লক্ষ্য শিক্ষার মান বাড়ানো। এর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাইলটিং করা হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণিতে ২০২৩ থেকে '২৭ সাল পর্যন্ত সময়ে, তা পর্যায়ক্রমে চালু করার জন্য। ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০০টি এবং মাধ্যমিকে ১০০টি প্রতিষ্ঠানে পাইলটিং করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাইলটিংয়ের ফলে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ের চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও সম্ভাবনাও চিহ্নিত হবে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষাদানের কেমন যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজন, তাও বেরিয়ে আসবে। আগামীর বিশ্ব হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রোগামিং, কোডিং শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই এসব বিষয়ে শিক্ষককে যোগ্য করে তুলতে হবে। কারণ তিনি একদিকে যেমন হাতে-কলমে শিক্ষা দেবেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর শিখনমূলক মূল্যায়ন ও মনিটরিং করবেন। এ জন্য শিক্ষকের প্রশিক্ষণ জরুরি। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর পাঠদানে নিয়োজিত আছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৩ শিক্ষক। এর মধ্যে ৭১ হাজার ৭০২ জন প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অগ্রগামী প্রযুক্তি নিয়ে শিক্ষাদান শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসবে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও আইসিটি বিভাগের দুটি উদ্যোগ রয়েছে, যা জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রযুক্তিসংশ্নিষ্ট গুণগত শিক্ষা, সৃজনশীলতা সৃষ্টি এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। একটি হচ্ছে ৩০০ সংসদীয় আসনের ৩০০ উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কুল অব ফিউচারে রূপান্তর। এ উদ্যোগের লক্ষ্য শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রচলিত পদ্ধতির শিক্ষায় পরিবর্তন এনে শিক্ষাদানে নতুন একটি পদ্ধতির প্রবর্তন, যা মূলত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্যও সহায়ক হবে। স্কুল অব ফিউচারে রূপান্তরের পরিকল্পনা সম্পর্কে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, 'এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে দক্ষতার জন্য এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত শিক্ষালাভের সুযোগ পাবে, যা তাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবন হলো এমন ধরনের দক্ষতা, যা বই পড়ার মাধ্যমে বা শিক্ষকদের ক্লাসরুমে বলার মাধ্যমে শেখানো যাবে না। এই দক্ষতা হলো এমন কিছু, যা এককভাবে অর্জন সম্ভব নয়, বরং অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিখতে হবে।' তৃতীয় উদ্যোগটিও গ্রহণ করা হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে সৃষ্ট পরিবর্তন ও বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য। এ জন্য আইসিটি নীতিমালা-২০১৮ এর সংশোধন করা হচ্ছে। সংশোধনের প্রক্রিয়ায় থাকা 'আইসিটি নীতিমালা-২০২১' শীর্ষক নীতিমালার একটি খসড়া আমার হাতে এসেছে। ২০০৯ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশবান্ধব আইসিটি নীতিমালা এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধিত আইসিটি নীতিমালা ২০১৫ ও ২০১৮-এর করণীয় এবং অধিকতর অগ্রাধিকারভিত্তিক করণীয়ের ইতোমধ্যে যেগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, তা বাদ দিয়ে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন করণীয় যোগ করা হচ্ছে। এ নীতিমালায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে জ্ঞান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরি, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন।

মানুষের সৃজনশীলতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি অগ্রগতি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মাণে অপরিহার্য। এই অগ্রগতির ভিত্তি হচ্ছে মানসম্মত আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা লাভ করে নতুন প্রজন্ম নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারে। এই দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আরেকটি উপায় হচ্ছে প্রশিক্ষণ। এমন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তার প্রয়োগ করে তারা দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও পশ্চাৎপদতার অবসান ঘটিয়ে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। তারা উদ্যোগী, সৃজনশীল এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বদানে সফল হয়ে উঠতে পারে।

সিনিয়র সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক সিটি এডিটর