গত সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের এক দুপুরে ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে যাই। খাওয়ার জন্য শহরের এক মোড়ে নামহীন কিন্তু স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকি। কয়েক বছর আগেও সেখানে গিয়ে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাতে খেয়েছি। এবার দুপুরে রেস্তোরাঁয় প্রবেশের সময় হঠাৎ পেছন থেকে কাঁধের কাছে এসে এক ব্যক্তি কী যেন বলে ওঠেন। দাঁড়িয়ে যাই। পেছন ফিরে দেখি- গায়ে জামা নেই, কোমর থেকে হাঁটু অব্দি লুঙ্গি, খালি পা, মাথায় উশকোখুশকো বড় চুলের প্রায় মধ্যবয়সী পুরুষ দাঁড়িয়ে। অপলক অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার দিকে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য জানতে চাই, তিনি কিছু বলেছেন কিনা আমাকে। করুণ আকুতির সুরে ভাত খেতে চাইলেন।

বহু ভিক্ষুক পথে টাকা চায়; অনেকে দেয়, অনেকে দেয় না। এটা যার যার ব্যক্তিগত চিন্তা, অভিরুচি ও সামর্থ্যের ব্যাপার। ক্ষুধায় কেউ খাবার চাইলে, তাকে যতটা সম্ভব খাওয়ানো আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কর্তব্য মনে হয়। খাবারপ্রার্থী যে-ই হোন, তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবহেলা বা বিরক্তির ঢঙে নয়, বরং যথাযথ সম্মান দিয়ে খাওয়ানোকেও গুরুত্বপূর্ণ আচরণ মনে করি।

খাবারপ্রার্থীকে আমার সঙ্গে রেস্তোরাঁয় ঢুকতে বললাম। আমার ইচ্ছা, তিনি রেস্তোরাঁয় আমার অতিথি হিসেবে বসে যা মন চায় খাবেন। আমি বিল দিয়ে দেব। কিন্তু ব্যক্তিটি বিদ্যুৎস্পর্শ পাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখালেন। ভয়ার্ত ভঙ্গিতে বারবার বললেন, রেস্তোরাঁয় ঢুকবেন না। কারণ জানতে চাই। যা বললেন তার সারমর্ম- রেস্তোরাঁয় তাদের প্রবেশ নিষেধ। শুনে বিস্ময় জাগল। মনে প্রশ্ন উঁকি দিল- তারা কারা, যাদের অতি সাধারণ খাবারের হোটেলে ঢোকার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আছে। খাবারপ্রার্থী ঘুরেফিরে শুধু এটুকুই জানালেন- রেস্তোরাঁয় তারা অবাঞ্ছিত। অভয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম, তিনি আমার অতিথি হয়ে খাবেন রেস্তোরাঁয়; কারও কিছু বলার সুযোগ নেই। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেটেও খাবার প্রার্থীর মন গলল না। সামান্য ভাতের জন্য আকুতি অব্যাহত রাখলেন, কিন্তু কিছুতেই রেস্তোরাঁয় ঢুকতে সাহস করলেন না। দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ওই ব্যক্তিকে খানিকক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, রেস্তোরাঁর ভেতর ক্যাশ কাউন্টারে গেলাম।

কাউন্টারে সুদর্শন যুবক। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে নায়কের মতো দেখাচ্ছিল তাকে। কর্মচারী মনে হলো না, বরং মালিক বা মালিকের ছেলে মনে হলো। কথা, আচরণে দৃশ্যত পড়ালেখা জানা, শিক্ষিত, স্মার্ট। বিনীত কণ্ঠে যুবককে বললাম, আমার অতিথি হিসেবে বাইরে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে রেস্তোরাঁর ভেতরে বসিয়ে খাওয়াতে চাই। বাইরে দাঁড়ানো খাবারপ্রার্থীর দিকে এক ঝলক দৃষ্টি ফেললেন সুদর্শন যুবক। তারপর ফুটন্ত তেলে বেগুন ছাড়লে যেমন ছ্যাঁত করে ওঠে, তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালেন। বিরক্তির সঙ্গে স্পষ্টতই জানালেন- আমি রেস্তোরাঁর ভেতরে বসে খেতে পারব, কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ আমার অতিথি ঢুকতে পারবে না। আমার আত্মবিশ্বাস ধাক্কা খেল। তবু আশা জাগিয়ে রেখে জানতে চাইলাম, কেন? যুবকের জবাব- ওদের (রেস্তোরাঁয়) ঢোকা নিষেধ। এমনকি কেউ যদি নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকে বসে খায় এবং কেউ তাকে চিনে ফেলে অভিযোগ করে, তখন তাকে বের করে দেওয়া হয়।

মুহূর্তে সীমাহীন বিস্ময় ঘিরে ধরল। আমার প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে গোটা তিন দশকে বহুবার ঘুরেছি; কখনও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। বরং এসব মানসিকতার চর্চা বহু বহুকাল আগের নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতা বলে পড়েছি, শুনেছি, জেনেছি, যা এই আধুনিক সময়ে দেশে অনেক ক্ষেত্রে বিলুপ্ত বলে মনে করতাম। নির্দিষ্ট শ্রেণি ও বিত্তের মানুষের জন্য তৈরি বিলাসবহুল হোটেল ও ক্লাবগুলোর নিয়ম ভিন্ন। সেগুলো ছাড়া দেশের কোথাও, এমনকি রাজধানীতেও অতি সাধারণ খাবারের হোটেল বা রেস্তোরাঁয় কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের ভেতরে ঢুকে খাওয়া নিষেধ- এমনটা আমি এর আগে দেখিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ একটি খাবারের হোটেলে কাদের খাওয়া নিষেধ- জানতে মন অস্থির হয়ে ওঠে। ক্যাশ কাউন্টারের যুবক বললেন, 'ওরা সুইপার।' আমি বললাম, সুইপার- তাতে কী হয়েছে? এটা তার পেশা, কিন্তু তিনিও তো মানুষ এবং আমার অতিথি হিসেবে খাবেন। এবার যুবক খানিকটা রুক্ষ ঢঙে বললেন, 'ওরা অন্য জাত। ওরা (রেস্তোরাঁয়) বসে খেতে পারবে না।'

'সুইপার' এবং 'অন্য জাত' শব্দ দুটি মাথায় হাতুড়ি পেটানোর মতো পেটাতে লাগল। যুবককে বললাম, ২০২১ সালে চরম আধুনিক জীবনযাত্রার সময়েও 'সুইপার ও অন্য জাত' বলে দেশের কোথাও একটি সাধারণ ভাত খাওয়ার হোটেলে একজন মানুষ টাকা দিলেও বসে খেতে পারবে না- এটা আমার কল্পনার বাইরের বাস্তবতা। কিছুতেই টললেন না ক্যাশ কাউন্টারের যুবক। ভগ্নহৃদয়ে যুবককে একটি বাজে কথা বলেই ফেললাম। বলি, তার জীবনের সব পড়ালেখা, জ্ঞান অর্জন বৃথা গেছে। আরও বললাম, আমরা যে নিজেদের এত শিক্ষিত, আধুনিক, বুঝদার এবং উন্নত জীবনের মানুষ দাবি করি, তার সবকিছু এই ২০২১ সালেও মিছে মনে হচ্ছে।

পরাজিত অনুভূতি নিয়ে যুবকের কাছে জানতে চাই, আমি যেহেতু মনস্থির করেছি খাবারপ্রার্থীকে ভাত খাওয়াব, কীভাবে সেটা সম্ভব? যুবক পরামর্শ দিলেন প্যাকেটে করে খাবার কিনে নিতে; তার রেস্তোরাঁর কর্মী আমার হাতে খাবারের প্যাকেট দেবেন। বাইরে গিয়ে আমাকে নিজের হাতে সেই খাবারের প্যাকেট দিতে হবে ওই ব্যক্তিকে, যিনি বা যারা শুধু পেশা আর জাতি পরিচয়ের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওই সমাজে শুধু চরম অবহেলিত-উপেক্ষিতই নন, আক্ষরিক অর্থেই সমাজ-বিচ্ছিন্ন এবং অস্পৃশ্য।

মর্মপীড়াদায়ক এ অভিজ্ঞতা গত বছরের একটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিল। করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে বিগত ২০২০ সালের মার্চের শেষ থেকে দেশে দু'মাসের 'সাধারণ ছুটি' দিয়ে জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে সরকার। দেশজুড়ে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন আয়ের মানুষ হয় সাময়িক কর্মহীন। তাদের জীবনযাপনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই সময় রাজশাহীর একটি গ্রামীণ জনপদে বিপদগ্রস্ত বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবার-সদস্যরা কোনো সরকারি-বেসরকারি খাবার সাহায্য পায়নি বলে ফোন করে একজন আমাকে জানান। নিজে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলি। জানতে পারি, তাদের গ্রামের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা সমাজে নানা রকম পরিচ্ছন্নতা ও দিনমজুরের কাজ করে। তারা সাধারণভাবে দেশে দলিত, হরিজন হিসেবে পরিচিত। বৃহত্তর সমাজে তাদের চলাফেরা মেলামেশার সুযোগ দেওয়া হয় না। তাই তাদের বিপদ ও জরুরি প্রয়োজনের কথা বলারও জায়গা নেই। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অমানবিক অভিজ্ঞতা শুনে তাৎক্ষণিক সরকারি খাদ্য সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে কিছু প্রচেষ্টার পরামর্শ ও সম্ভাবনার কথা বলি তাকে। তখন তিনি বলেছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দেখা পাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব। কারণ ইউএনওর কার্যালয়ের বারান্দায়ই উঠতে পারেন না তারা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পিওন তাদের সঙ্গে কথা বলেন। হরিজন, দলিতরা দাঁড়িয়ে থাকেন তার থেকে খানিক দূরে। তার পর পিওন তাদের কথা শোনেন। সেগুলো ইউএনওকে পরে জানাবেন বলে পিওন বিদায় দিয়ে দেন তাদের।

পাদটীকা :নিরুপায় হয়ে প্যাকেট খাবার কিনে দিয়েছি অতিথিকে; নিজে সেই রেস্তোরাঁয় খাইনি। পরাজয় আর প্রচণ্ড অপমানের গ্লানি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দল সাংবাদিকের কাছে মিনতি জানিয়েছি তাদের সমাজের চিরকালীন এই নিষ্ঠুর বৈষম্য নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে লিখতে। সাংবাদিকদের ধারাবাহিক লেখনী রংপুরের মঙ্গা বা মৌসুমি দুর্ভিক্ষের মতো দীর্ঘকালীন সমস্যার সমাধান খুঁজতে ভূমিকা রেখেছে; চিরকাল অবহেলিত হিজড়া জনগোষ্ঠী বিগত ১০ বছরে নিজেদের লিঙ্গ পরিচয়ে ভোটার হওয়ার অধিকার পেয়েছে। আর্থ ও খাদ্যসহায়তা দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু বৃহত্তর সমাজে মানুষ ও নাগরিক হিসেবে সব অবহেলিত গোষ্ঠীর সম্মান, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি, সব প্রশাসন, পেশা ও গোটা সমাজের বৃহৎ মানবিক দায়িত্ব।

সাংবাদিক