রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যার তিন সপ্তাহের মাথায় বৃহস্পতিবার রাতে একটি মাদ্রাসায় ঘুমন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ব্রাশফায়ার চালিয়ে ও কুপিয়ে হতাহতের ঘটনাটি ফের শুধু ক্যাম্পের নিরাপত্তাই নয়, সামগ্রিকভাবে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র হামলায় ৭ জন নিহত ও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ওই প্রতিবেদনেই সন্ত্রাসীদের আক্রমণের যে কৌশল-চিত্র উঠে এসেছে, তাতে প্রতীয়মান, প্রায় দেড় ঘণ্টা চলা ওই নারকীয় তাণ্ডবর্ পরিকল্পিনাপ্রসূত। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্যাম্পে এত অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটছে কীভাবে? মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, তা নিছক ব্যক্তিগত বিরোধের জের ছিল না।

আমরা মনে করি, ফের যে বর্বরোচিত ঘটনা উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে ঘটল, তা যে কোনো বিচারে চরম উদ্বেগজনক। আমরা জানি, গত চার বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই শতাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৪টি। সংঘর্ষের ঘটনা তো প্রায়ই ঘটছে। পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তাতে বলা যায়, এর কোনো ঘটনাই শুধু ব্যক্তি মানুষকে নিঃশেষ করে দেওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাসহ শিক্ষকরা একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও তাদের সমর্থিত আল ইয়াকিন ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে ক্যাম্পে 'উলামা কাউন্সিল' গঠন করেছে। অভিযোগ আছে, তারা মাদ্রাসা ও ক্যাম্পের মসজিদগুলো তাদের দখলে নিতে চাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিরোধের জের ধরেই নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে।

আমরা এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি খুনিদের ও নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করার জোর তাগিদ দিই। তা ছাড়া শরণার্থীরা এত সংগঠন গড়ে তাদের কর্মকাণ্ড চালায় কীভাবে- এ প্রশ্নও রাখি। আমরা জানি, ২০১৭ সালে নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে মুহিবুল্লাহ বাংলাদেশে আসার পর থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। আমরা দেখছি, তার হত্যার পর উখিয়াসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনস্বীকার্য যে, রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প স্পর্শকাতর অঞ্চল। কিন্তু ফের বোঝা গেল, ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এখনও ঘাটতি রয়েছে অনেক। প্রশ্ন হচ্ছে, বালুখালী ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটাল; এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা কেন কোনো কিছুই আগাম টের পেল না? এর আগেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেক অঘটন ঘটেছে। কিন্তু বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি এসব কারণে ঘটেনি, ধারণা করা যায়।

আমরা বরাবরই বলে আসছি, এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে উৎসে হাত দেওয়া জরুরি। এর সঙ্গে আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। আমরা মনে করি, বৃহস্পতিবারের ঘটনাসহ এর আগের সব ঘটনার রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবাসন ও নিরাপত্তায় আরও জোর তৎপরতার বিকল্প নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানতম দাবি- প্রত্যাবাসন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতিসংঘের অধিবেশনে তার ভাষণে ফের এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যে সংকট মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে, এর সমাধান তাদেরই করতে হবে।

আমরা জানি, তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার যে চুক্তি করেছিল, তারা এর ব্যত্যয় করে চলেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় এভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও তা হুমকিস্বরূপ। প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারেও সমগুরুত্ব দিয়ে কাজ চালানো জরুরি।