মুকিত মজুমদার বাবুকে যে 'প্রকৃতিবন্ধু' আখ্যা দেওয়া হয়, তার মধ্যে অত্যুক্তি নেই। প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে তার নিবিড় সখ্য। অন্তর দিয়ে অনুধাবন করেন তিনি প্রকৃতির ভাষা। জন্মভূমির প্রতি আজন্ম ঋণই তাকে করে তুলেছে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধ। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি দূষণমুক্ত সুস্থ-সুন্দর প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার প্রত্যয়ে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলা ও অভিযোজন সম্পর্কিত গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ- চ্যানেল আইতে ধারাবাহিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান 'প্রকৃতি ও জীবন'। ইতোমধ্যে দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠানটির ৩৪৫টি পর্ব প্রচার হয়েছে। প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা ও চেতনার বিষয়টি প্রাধান্য পায় তার লেখনীতে। তিনি নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। সম্পাদনা করছেন 'প্রকৃতি ও জীবন' শিরোনামে জাতীয় দৈনিকে রঙিন একটি পূর্ণাঙ্গ পাক্ষিক পাতা। প্রতি বছর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রকৃতিবিষয়ক গ্রন্থ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- 'আমার অনেক ঋণ আছে', 'আমার দেশ আমার প্রকৃতি', 'আমার রূপসী বাংলা' 'সবুজ আমার ভালোবাসা', 'স্বপ্নের প্রকৃতি', 'সবুজে সাজাই আমার বাংলাদেশ' ইত্যাদি। খ্যাতিমান লেখকদের লেখা নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থ 'প্রকৃতিকথা'। ত্রৈমাসিক পত্রিকা 'প্রকৃতিবার্তা'র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি তিনি। এ ছাড়া নিয়মিত প্রামাণ্যচিত্রের পেনড্রাইভ, লিফলেট, বই, দিনপঞ্জি প্রকাশ করাসহ বিনামূল্যে তা তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করছেন।

বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ, প্রতি বছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ, দেশি প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, গোলটেবিল বৈঠক, পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মশালা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় গাছের পরিচিতি ফলক সংযুক্তকরণ, পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, পরিবেশ সচেতনতামূলক স্কুল প্রোগ্রাম, প্রকৃতিপল্লি প্রতিষ্ঠা, প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। প্রজাপতি পার্ক প্রতিষ্ঠা, পাখিশুমারি ও পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণ, মহাবিপন্ন বড় কাইট্টা (বাটাগুর বাসকা) কাছিম প্রজনন ও সংরক্ষণ, বিপন্ন শকুন সংরক্ষণ, শিকারি পাখি গবেষণা ও সংরক্ষণে অবদান রেখে যাচ্ছে তার প্রতিষ্ঠান 'প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন'। পরিবেশ সংরক্ষণে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে নিয়মিত আয়োজন করছেন প্রকৃতি মেলা। পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য তার প্রতিষ্ঠিত 'প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন' থেকে প্রতি বছর দেশের গবেষকদের দেওয়া হচ্ছে প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক।

পরিবেশবিষয়ক বহুমাত্রিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে 'জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১২', 'বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন-২০১৩', 'জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১৫', 'এইচএসবিসি-দ্য ডেইলি স্টার ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড-২০১২', 'ঢাকা আহছানিয়া মিশন চাঁদ সুলতানা পুরস্কার-২০১৫', 'ফোবানা অ্যাওয়ার্ড ইউএসএ-২০১৬', 'বিজনেস এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড সিঙ্গাপুর-২০১৪', 'পল্লীমা গ্রিন স্বর্ণপদক-২০১৭', 'এ ফ্রেন্ড অব নেচার-২০২১'সহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন মুকিত মজুমদার বাবু ও তার প্রতিষ্ঠান 'প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন'।

আজ মুকিত মজুমদার বাবুর জন্মদিন। তার শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত সময় কেটেছে গাঢ় সবুজের সান্নিধ্যে। ১৯৭১ সালে স্কুলে অধ্যয়নকালেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিদেশ যান। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফেরেন ১৯৮৪ সালে। ইমপ্রেস গ্রুপের তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তবে দেশ-বিদেশে তিনি প্রকৃতিবন্ধু নামে পরিচিত। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে, প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে, প্রকৃতি সুরক্ষায় অন্যদের উৎসাহিত করতে বিশেষ মনোযোগী তিনি। এসব তৎপরতাতেই তার আনন্দ।

মুকিত মজুমদার বাবু পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়তে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তবে প্রকৃতি সুরক্ষায় তার যুদ্ধ আজও চলমান। প্রকৃতির জন্য তার নিরলস কর্মতৎপরতা অব্যাহত থাকুক অনাগত দিনগুলোতেও। চিরসবুজ মানুষটিকে জন্মদিনে জানাই শুভেচ্ছা।

সাংবাদিক
saifulksg@gmail.com