ক্লিন ফিড বা বিজ্ঞাপনমুক্ত করে বিদেশি চ্যানেলের কনটেন্ট পাঠানোর আলোচনা 'নতুন' হলেও বিষয়টি পুরোনো। দেড় দশক আগে করা সম্প্রচার আইনে থাকা এ বিষয়টি যৌক্তিক এবং দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী। কিন্তু কেবল অপারেটরদের নানাভাবে বলেও যখন এটা কার্যকর করতে পারেনি সরকার, তখন চরম পদক্ষেপ নেওয়া হলো চলতি মাসের শুরুর দিন। ক্লিন ফিড না থাকা সব বিদেশি চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে।

ক্লিন ফিড নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল মালিকদের সংগঠন সব সময় তাদের দাবির কথা জানিয়েছে এবং এবার সেটা কার্যকর করার পদক্ষেপের পর বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু সংবাদ চ্যানেলগুলো বাদে বাকি চ্যানেলের এই উচ্ছ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হবে না। শেষ পর্যন্ত এ পদক্ষেপের ফসল তাদের গোলায় উঠবে? বিরাজমান বাস্তবতায় দেশে ক্লিন ফিড নিশ্চিত করার মূল সুফল পাবে দেশের বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো এবং বিজ্ঞাপন শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী-কলাকুশলীরা। ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া যাক।

বাংলাদেশে বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলগুলো ইতোমধ্যে ক্লিন ফিড পাঠাতে শুরু করেছে। যে কোনো অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বিরতিতে এখন আর সেই দেশের বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে না। সে জায়গাটি বেশি দিন ফাঁকা থাকবে না। দর্শকদের চাহিদাসম্পন্ন চ্যানেলগুলোর সেই জায়গায় দেশীয় বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন আসবে অচিরেই। বিদেশি চ্যানেলগুলো সেই বিজ্ঞাপনের আয়ের কিছু অংশ পাবে।

বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় বিভিন্ন বিনোদন চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরিমাণ বাড়লে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় বিজ্ঞাপন নির্মিত হবে। এর সরাসরি সুফল পাবে দেশের বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো; তাদের আয় এখনকার চাইতে অনেক বাড়বে।

যখন অসংখ্য দর্শক দেখছে এমন চ্যানেলের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হবে, তখন বিজ্ঞাপনের মানোন্নয়নের চেষ্টা হবে। তাই বাজেটও বেড়ে যাবে অনেক। এর সুফল পাবেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা, বিজ্ঞাপনের মডেল এবং এর সঙ্গে জড়িত সব কলাকুশলী। নিশ্চিতভাবেই এটা দেশের জন্য ভালো হবে। কিন্তু এর প্রভাব আমাদের দেশীয় চ্যানেলগুলোর ওপর আদৌ পড়বে কি? পড়লে কতটুকু এবং কেমন প্রভাব পড়বে?

বর্তমান সময়ে তরুণদের খুব বড় একটা অংশ এখন টিভি দেখে না। বিনোদনের জন্য নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তাদের কাছে পছন্দনীয়। খেলা দেখার বাইরে দেশের যেসব মানুষ নিয়মিত টিভি দেখে তার মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে আছে সিরিয়াল, সিনেমা, সিনেমার গান, রিয়েলিটি শো-নির্ভর ভারতীয় বিনোদন চ্যানেলগুলো। এই চ্যানেলগুলো যদি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হতো তাহলে অনেকেই হয়তো চেষ্টা করবেন বিকল্প পথে এসব চ্যানেল দেখা যায় কিনা সেটা বের করতে। যারা সেটাও পারবেন না, তাদের একটা অংশ হয়তো বাংলাদেশি বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলগুলো দেখতে শুরু করতেন।

কিন্তু বাংলাদেশের এই চ্যানেলগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়নি। যতই বলা হোক না- বাংলাদেশের বাজার তাদের জন্য যথেষ্ট না; এটা ভুল। সরকার কঠোর ছিল বলে চ্যানেলগুলো ক্লিন ফিড নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে ফিরে আসা শুরু করেছে; বাংলাদেশের বাজার অনেক বড় এবং এটা দ্রুত বাড়ছে।

এখন বাংলাদেশের একজন পণ্য বা সেবা উৎপাদনকারীর কথা ভাবা যাক। তিনি তার বিজ্ঞাপন তেমন চ্যানেলে দেবেন, যেটা দেখে থাকে অনেক বেশি মানুষ। দেশি চ্যানেলগুলোর তুলনায় সেখানে বিজ্ঞাপন দেওয়ার খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে, তবুও তিনি সেটা করবেন। কারণ এতে তার সেই বিনিয়োগের রিটার্ন অনেক বেশি পাবেন। আমি দেশি বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলগুলোর জন্য বরং আরেকটা আশঙ্কা দেখছি।

এতদিন ভারতীয় বিনোদন চ্যানেলগুলোতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন দেওয়া খুব সহজ ছিল না। ক্লিন ফিড হয়ে যাওয়ার পর দেশি ব্যবসাগুলো খুব সহজেই সেই চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে। সেটা করা গেলে দেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতে যাবেন কেন তারা? অর্থাৎ এই ঝুঁকি বরং আছে- দেশীয় বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলগুলোর বর্তমান বিজ্ঞাপনও কমে যেতে পারে। এই প্রভাব সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে খুব কম পড়ার আশঙ্কা। কারণ সেসব চ্যানেলের দর্শক শ্রেণি ভিন্ন।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর যেসব অনুষ্ঠান এ দেশের মানুষ দেখেন সেগুলো কেমন, তার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপরে কীভাবে পড়ছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ এসব চ্যানেল দেখছে। আমাদের দেশের অনেক বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলই মানুষ খুব একটা দেখে না। বিজ্ঞাপনের আধিক্যকে একটা কারণ হিসেবে চ্যানেলগুলোর পক্ষ থেকে বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণ বলে মনে করি না।

আমরা পছন্দ করি বা না করি, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমাদের বসবাস, সেখানে বাজারই আখেরে নির্ধারণ করে কোনো কিছু কেমন হবে। চাহিদাই নিশ্চিত করে কোনো কিছুর মূল্য কতটা দাঁড়াবে। আমাদের দেশি বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলগুলো দর্শকের চাহিদা ঠিকভাবে মেটাতে পারছে না। এটা মেনে নিয়েই আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে হবে এবং সেখান থেকে এগোতে হবে।

এতদিনে ভারতীয় বিনোদন চ্যানেলগুলো আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোর জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। এখন এই চ্যানেলগুলো ক্লিনফিড হওয়ার পর ব্যবসায়িকভাবে আমাদের দেশি বিনোদন চ্যানেলগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে; নিশ্চিত। নিজেদের বাজারের উপযোগী করে তৈরি করতে না পারলে সামনে খুব বড় সংকট অপেক্ষা করছে দেশি বিনোদনভিত্তিক চ্যানেলগুলোর জন্য।

শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী