সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের 'পরীক্ষা সংক্রান্ত' ঘোষণা অনেককেই বিস্মিত করেছে। ২০ অক্টোবর সমকালে মাহফুজুর রহমান মানিকের এ সংক্রান্ত একটি বিশ্নেষণমূলক ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখা পড়লাম। এরই ধারাবাহিকতায় এ লেখাটি। 'পরীক্ষা' আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে একটি ভীতিকর শব্দ। শুধু আমাদের দেশ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ এবং উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায়ও 'পরীক্ষা' সহজভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এর নানাবিধ কারণ রয়েছে, যা সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে কয়েকটি প্রধান বিষয় এখানে তুলে ধরা যাক।

আমরা সবাই কভিড-১৯ এর মারাত্মক প্রভাবে জীবনের সর্বক্ষেত্রে নানান জটিলতা ও তার সমাধানে ব্যস্ত। এর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক, প্রশাসন; সর্বোপরি শিক্ষা-শিখন ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত। জীবন ও জীবিকার তাগিদে লকডাউন শিথিল করে হয়তো বিশাল এক জনগোষ্ঠীর উপকার হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর বিষয়টি আমরা কতটা ভেবেছি?

শিক্ষার ওপর কভিড-১৯ এর প্রভাব আমাদের মতো দেশগুলোতেই শুধু নয়, উন্নত বিশ্বেও পড়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে 'সেকেন্ড হোম'; বিশেষ করে দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য। খবরে দেখা গেছে, সম্পদশালী ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা বিভিন্ন ধরনের বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেখানেও নানা বিপত্তি দেখা গেছে। লকডাউন এবং এর মেয়াদ কেবল শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। খবরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে ভালো ছাত্র, ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান আত্মহত্যা করেছে। কারণ হিসেবে লকডাউন, বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়া, অন্যদের সঙ্গে মিশতে না পারা, একাকিত্ব ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। আসলেই একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি ভালো পরিবারেরই প্রতিচ্ছবি। যেখানে সহপাঠী ও সমপাঠীরা একত্রে পড়তে পারে, হাসি-গল্প পাঠ্য, মজা, খেলাধুলা করতে পারে। ছোট্ট পারিবারিক জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে খোলা ও মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারে। দিনের একটি বিরাট অংশ নিজের অস্তিত্বের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। সে এক আলাদা জগৎ ও আনন্দ।

অনেক ঘোষণার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে তা চালু করা হচ্ছে। সেটা ভালো কি মন্দ, তা এখনও মূল্যায়নের সময় আসেনি। প্রাথমিকে পঞ্চম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকে দশম কিংবা এসএসসি ছাড়া বাকি সবাই সপ্তাহে একদিন স্কুলে যাচ্ছে। এবং বিশেষ কিছু বিষয়ে স্বল্প সময়ের জন্য (২/১ ঘণ্টা) ক্লাস হচ্ছে। লকডাউনের সময় অবশ্য কিছু শিক্ষকের আইসিটি ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন আইসিটি ব্যবহার করে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার কার্যকারিতা এখন গবেষণার মাধ্যমে নির্ণয়যোগ্য! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার এক মাসের মধ্যেই পরীক্ষার তারিখ ও রুটিন দেওয়া অনেকের জন্যই অপ্রত্যাশিত। অনেকেই অপ্রস্তুত একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন। পরীক্ষার জন্য বিষয়বস্তু, নম্বরের মাত্রা/মান :বিষয় ৫০ নম্বর পরীক্ষার জন্য অ্যাসাইনমেন্ট ৪০ ও অন্যান্য ১০। মান বণ্টনের দিক থেকে পরীক্ষাকে সহজ মনে হলেও অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে তা ভীতিকর।

আমাদের দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত শিক্ষা-শিখন পদ্ধতির মাধ্যমে যেসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে, তা সামগ্রিকভাবে অর্জন করা সম্ভব হয় না। কভিড চলাকালীন এটি আরও প্রশ্নবিদ্ধ। অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেল, আরও কিছুদিন ক্লাস চলার পর বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যয়ন রেকর্ড পর্যালোচনা করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারত। লকডাউনে ইন পারসন ক্লাস বন্ধ ছিল। অনলাইন ক্লাস হয় অনিয়মিত ও অপরিমিত। প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষকদের পারদর্শিতার অভাব, প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি, এর অপ্রতুলতার কারণে বেশিরভাগ গ্রামীণ শিক্ষার্থীর কাছে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পৌঁছে দেওয়া ছিল অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। নানা সমস্যায় একটি সুন্দর বিকল্প শিক্ষা-শিখন পদ্ধতি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। এ পরিস্থিতির মধ্যে স্কুল খোলার স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষার ঘোষণা!

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে- পরীক্ষা, নাকি মূল্যায়ন? শিক্ষার্থী কতটুকু পাঠ আয়ত্ত করতে পেরেছে, তা যাচাই করে দেখা, নাকি কভিড পিরিয়ডে শিক্ষার পাশাপাশি তার অন্যান্য সুপ্ত ক্ষমতার কতখানি অর্জিত হয়েছে, তার সঙ্গে মানচিত্র পর্যালোচনা করা? কোনটি বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে? নীতিনির্ধারকরা তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন। কভিড অতিমারি শিক্ষার্থী বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, আবেগিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে; নীতি প্রণয়নকারী, শিক্ষাবিদ, শিক্ষকদের কাছে জটিল প্রশ্ন ও সমাধান খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তাদের তথ্য প্রয়োজন। যা হোক, এ সময়ে 'পরীক্ষা' দিয়ে লেখাপড়া কতটা চালিয়ে নেওয়া যাবে?

'পরীক্ষা' শব্দটি ব্যবহার না করে 'মূল্যায়ন' শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। গুরুত্ব ও পদ্ধতি হিসেবে তা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। পরীক্ষা আমাদের দেশে কিছু নম্বর বা মান দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন বিশেষ করে বিষয়জ্ঞান অর্জনের মাত্রা যাচাই। কিন্তু 'মূল্যায়ন' শব্দটি পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। অতি সংক্ষেপে বলা যায়, মূল্যায়ন হলো শেখার জন্য শেখা এবং ওই শেখার মূল্যায়ন। এই দিকগুলো এখন শক্তিশালী করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা দরকার। একবিংশ শতাব্দীর শিখন দক্ষতা এবং শিক্ষক দক্ষতা আয়ত্তকরণে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। ১৮ মাসে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক শিখন, শারীরিক-মানসিক গুণাবলির বিকাশের মাত্রা কি 'পরীক্ষা' নামক একটি উপায়ের মাধ্যমে নির্ণয় সম্ভব? সামগ্রিক পারদর্শিতা অর্জনের পরীক্ষা ও মানদণ্ড নির্ণয়ের যথার্থতা এবং নির্ভরতা কীভাবে নির্ণয় করা হবে? নীতিনির্ধারকদের কাছে এই প্রশ্নগুলো রাখছি। কারণ নতুন শিক্ষাক্রম, শিখন শেখানো পদ্ধতি মূল্যায়ন ব্যবস্থা যেন শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে ও তা অর্জনে সহায়ক হয়।

অধ্যাপক; সাবেক পরিচালক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়