মধ্যবিত্ত নিয়ে অনেকেই অনেকভাবে ভাবছেন। এ ভাবনা থেকেই আমরা প্রশ্ন রাখছি- মধ্যবিত্ত কোথায় গেল? প্রশ্ন আরও থেকে যায়। মধ্যবিত্ত শুধুই একটি শ্রেণি, নাকি একটি আকাঙ্ক্ষা? নাকি একটি মূল্যবোধ? নাকি এগুলো এ সবকিছুর সংমিশ্রণ এবং অন্য আরও কিছু? তাদের সামাজিক ভূমিকার স্বরূপ কী? এসব প্রশ্নের উত্তরও বিভিন্ন দিক থেকে নানাভাবে আসবে। আসছেও। আমরা পিপিআরসির উদ্যোগে সম্প্রতি যখন বিষয়টি নিয়ে একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করি, সেখানেও নানা বক্তব্য এসেছে। মধ্যবিত্ত কোথায় গেল- এ প্রশ্নের মধ্যে একটা টুইস্ট আছে। বিতর্কও থাকতে পারে। এর সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যাও হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে মোটা দাগে আমরা কিছু কথা বলতে পারি। নানা আলোচনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে একটা উপসংহারে পৌঁছাও অসম্ভব নয়।

বলাবাহুল্য, মধ্যবিত্তের সঙ্গে বিত্ত তথা অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি চিরন্তন। একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি হিসেবে বিত্তের মানদণ্ডে মধ্যবিত্তের শ্রেণিকরণ রয়েছে। এডিবি তথা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক একটা হিসাব করেছে। এ হিসাবও যে সর্বজনীন, তাও বলা যায় না। তারপরও হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ। এডিবির হিসাবে যাদের আয় মাথাপিছু দৈনিক দুই থেকে ২০ ডলার, তারাই মধ্যবিত্ত। কিন্তু এটি আসলে অনেক বেশি বিস্তৃত সংজ্ঞা। এটির অভ্যন্তরীণ বিন্যাস আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে এই বাড়তি বিন্যাসের কাজে মনোযোগী হয়েছেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পিপিআরসির তরফ থেকে আমরা বলছি, যাদের আয় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে তারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা আয় যাদের, তাদের বলা যায় মধ্য-মধ্যবিত্ত। এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা মাসিক আয়ের অধিকারীরা উচ্চ-মধ্যবিত্ত।

মধ্যবিত্তকে এভাবেও দেখা যায়, তারা দারিদ্র্যের দোদুল্যমানতা থেকে কিছুটা মুক্ত, আবার প্রাচুর্যের সুখেরও বাইরে। অর্থাৎ একটা মাঝবৃত্তে আটকে আছে মধ্যবিত্ত। এর মধ্যে আবার পুরোনো মধ্যবিত্ত ও উঠতি মধ্যবিত্তের ধারণা সামনে আসছে। আগে যারা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিত, তারা একটা ভালো অবস্থানে রয়েছে, বলা যায়। তাদের সঙ্গে নতুন মধ্যবিত্তের কিছু দ্বন্দ্বও রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের আলোচনাটা আমরা করছি এ জন্যই, তাদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে কিনা। এই যে আমরা ই-কমার্সের কথা বলছি, এর মাধ্যমেও মধ্যবিত্তের এক ধরনের ডাইনামিকস তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ই-কমার্সে একটা সংকটও তৈরি হয়েছে। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

মধ্যবিত্তের আলোচনায় মূল্যবোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবিত্ত অনেকে গ্রাম থেকে শহরে আসেন। গ্রামের পরিবেশ আলাদা, শহরের আলাদা। গ্রামেও সুন্দর পরিবেশ আছে- সেটা অস্বীকার করা যাবে না। তারপরও গ্রাম থেকে মানুষ শহরে আসছে। মধ্যবিত্তও এসেছে এবং আসছে। আমাদের শহরের নাগরিকদের দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি, দেখা যাবে তাদের অনেকের মধ্যে সে শিষ্টাচার গড়ে ওঠেনি। এটা শহরের অভিজাত এলাকা বলি আর অন্য এলাকাই হোক। আমি নিজে কৌতূহলী হয়ে লক্ষ্য করেছি, ঢাকার বসুন্ধরার যে অবস্থা, পুরান ঢাকারও একই অবস্থা। অর্থাৎ সেখানকার ঘিঞ্জি এলাকার মানুষের শিষ্টাচারের সঙ্গে তুলনামূলক ধনী এলাকার তেমন পার্থক্য নেই। আমরা এখনও খাবার টেবিলে হুড়োহুড়ি দেখি। আমাদের শিষ্টাচারের ঘাটতির এটাও একটা প্রমাণ। তাই মধ্যবিত্তের জন্য নাগরিক শিক্ষাটা গুরুত্বপূর্ণ।

আগেকার সময়ে মধ্যবিত্তকে আমরা যেভাবে দেখেছি, বর্তমান মধ্যবিত্ত সেভাবে নেই। রাজনৈতিক ময়দানেও তাদের ভূমিকা রাখতে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। ঔপনিবেশিক দেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। বর্তমানে মধ্যবিত্তকে আর রাজনীতিতে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশে গত ২০-৩০ বছর ধরে দারিদ্র্যের হার দ্রুতই কমেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকারও বেড়েছে। যদিও পিপিআরসির গবেষণায় দেখা গেছে, কভিডের কারণে দরিদ্রতা কিছুটা আবার বেড়েছে। নিম্ন-মধ্যবিত্তরা কিছুটা দারিদ্র্যসীমায় চলে গেছে। তবে মোটা দাগে মধ্যবিত্তের আকার বেড়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক ভূমিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গরিবরা জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ব্যস্ত। তাদের তুলনায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে ওপরের শ্রেণি অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে পারে। এমনকি আজ যে মধ্যবিত্তের কথা আলোচনা হচ্ছে, তারা জ্ঞানমনস্ক, মননশীল, সংস্কৃতিমান ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষের মধ্যেই একটা গোষ্ঠী। যারা সমাজে মতামত তৈরিতে ও উন্নত মনমানসিকতাসম্পন্ন নৈতিক সমাজ গঠনে অবদান রাখতে ও নেতৃত্ব দিতে পারেন। এ বুদ্ধিবৃত্তিক মধ্যবিত্তকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে মধ্যবিত্তের বিষয়ে আমার মত হলো, আমাদের আরও বাস্তবিক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের নিয়ে যথাযথ গবেষণাও জরুরি। মধ্যবিত্তের অনেক বিষয় রয়েছে, যা নিয়ে ভালো গবেষণা হতে পারে অথচ হচ্ছে না। গ্রামেও মধ্যবিত্তের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস করে, সেখানে এখন কৃষকের লাঙল নেই। লাঙল দেখতে গেলে বলা চলে আমাদের জাদুঘরে যেতে হবে। সেখানে এখন কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার হচ্ছে। নগরেও গবেষণা দরকার। নতুন বাস্তবতার আলোকে আমাদের মধ্যবিত্তকে দেখা জরুরি। আমরা পুঁজির কথা বলি। এ পুঁজি যেমন অর্থনৈতিক, তেমনি সাংস্কৃতিকও বটে। তবে মধ্যবিত্তের একটা পরিচয়ের পুঁজিও থাকা দরকার। তা না হলে মধ্যবিত্ত ক্ষয়িষ্ণু হবে। আমরা সমাজে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে মনোযোগ দিচ্ছি কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন করছি না। আসলে আমরা পুরোনো চিন্তার মধ্যেই আটকে আছি।

আমরা পুরোনো এবং উঠতি মধ্যবিত্তের মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা বলছি। কিন্তু এর মধ্যে পড়ে থাকলেই চলবে না। এই দ্বন্দ্বে ঘুরপাক খাওয়ার বিপদ হলো, এর মাধ্যমে না কোনো সমাধানে পৌঁছা যাবে, না আমাদের ভবিষ্যৎ বের হবে। দ্বন্দ্ব বাস্তবতারই অংশ, তবে এটি চূড়ান্ত কিংবা পূর্ণাঙ্গ নয়। উঠতি এবং কায়েমি মধ্যবিত্তের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ প্রয়োজন। তাহলে উভয় মিলে একটা বৃহত্তর শক্তি হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সংযোগকারীর ভূমিকা পালন করবে কে? এখানে রাষ্ট্রও সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। আরও নানা কারণে রাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রে আইনের শাসন না থাকলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অন্যদের দ্বারা ব্যবহূত হতে থাকবে। যেমন আমরা আজকের ছাত্র রাজনীতি দেখছি। তারা অধিকাংশই আজ নিজেদের ছাত্রদের কল্যাণে ভূমিকা পালনের পরিবর্তে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

মধ্যবিত্তের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক গভীর। কিন্তু এখানেও নতুন সংজ্ঞায়ন জরুরি। আলোকিত মানুষ কেবল শিক্ষার মাধ্যমেই আসছে না; কেউ স্বশিক্ষিত হয়েও আলোকিত মানুষ হতে পারে। কারও পুঁথিগত বিদ্যা না থাকলেও প্রায়োগিক বিদ্যায় যে কেউ ভালো করতে পারে। এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষিত না হয়েও কেউ করতে পারে। মেধা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে যে কেউ এগিয়ে যেতে পারে। কর্মজীবী মানুষকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আজ বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখছে। এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সম্মিলিত অবদানে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের জন্য রাষ্ট্র কতটা করছে? বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁসের কারণ। করোনার কারণে ইতোমধ্যে মধ্যবিত্তের উল্লেখযোগ্য অংশ সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে যদি দীর্ঘমেয়াদে বাজার অস্থিতিশীল থাকে, সেটি তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমাদের সামাজিক 'টার্নিং পয়েন্ট'টি চিন্তা করতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও দিতে হবে। না হলে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটবে না। আমরা দেশ গঠনে মধ্যবিত্তের বৌদ্ধিক অবদান থেকেও বঞ্চিত হবো। এবং মধ্যবিত্ত কোথায় গেল- এ প্রশ্নেরও মীমাংসা দুরূহ হবে।

অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পিপিআরসি