যশোর শিক্ষা বোর্ডে দুর্নীতির অভিযোগে শীর্ষ দুই দায়িত্বশীলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা যেমন হতাশাজনক; তার চেয়েও বিস্ময়কর বোর্ডটির চেয়ারম্যান ও সচিবের 'লাপাত্তা' হওয়ার ঘটনা। সোমবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, ৭ অক্টোবর অডিটকালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে চেক জালিয়াতির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়ার পর ১৮ অক্টোবর পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় যশোরের সহকারী পরিচালক। এতে অভিযুক্তদের মধ্যে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবও রয়েছেন। কিন্তু মামলা হওয়ার দিনই তারা তাদের বাংলো থেকে বের হয়ে যান। এর পর সপ্তাহখানেক অফিস করেননি। সেখানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে হয়েছে। তারা উভয়েই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এমনকি দায়িত্বশীল পদে থেকেও যে নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছেন, তা নিন্দনীয়। যশোর শিক্ষা বোর্ডে দুর্নীতি হয়েছে- এটা স্পষ্ট। কিন্তু যা-ই ঘটুক, বোর্ডের প্রধান হিসেবে চেয়ারম্যান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সচিব তাদের কর্মস্থলে থাকবেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যা হয়, মেনে নেবেন- সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। তা না করে উভয়েই যেভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন, তাতে এ ধারণা অমূলক নয়- এ ঘটনার আড়ালে আরও ঘটনা কিংবা বড় কোনো দুর্নীতি রয়েছে। এরই মধ্যে সেখানে আরও আড়াই কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অতীতেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি বরিশাল শিক্ষা বোর্ড, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার এবং যশোর বোর্ডে সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমনকি দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে তাকে যশোর বোর্ডে সচিব পদ থেকে বদলিও করা হয়। আমরা বিস্মিত, এর পরও কীভাবে তাকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে! অতীতে দুর্নীতি করে পার পাওয়ার কারণেই তিনি এতটা বেপরোয়া হয়েছেন বলে আমরা মনে করি। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে এমন দুর্নীতি জেঁকে বসা অস্বাভাবিক নয়। শিক্ষা প্রশাসনেই নানা ধরনের দুর্নীতির খবর আমরা দেখেছি। 'মৃত' শিক্ষকের নামে বেতন-ভাতা তুলে আত্মসাতের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমপিও, বদলি থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজেই ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার অভিযোগ বিস্তর। এ মাসের শুরুতে আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই মাধ্যমিক শিক্ষায় ঘুষের বিষয়ে লিখেছি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় নিয়োগ, বদলি, এমপিওভুক্তি থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজে পদে পদে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন হয়। এমনকি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণেও। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড আর শিক্ষা বোর্ডগুলোতেও কতটা অনিয়ম হচ্ছে; যশোর বোর্ডের অঘটনই তার প্রমাণ।

আমরা মনে করি, শিক্ষা প্রশাসনসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। কাউকে বড় পদে আসীন করার আগে অবশ্যই তার অতীত দেখা উচিত। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও দায়িত্বশীল পদে পদায়ন করার ফল কী হতে পারে, যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ডই তার প্রমাণ। এখন তার কারণে গোটা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধই নয় শুধু, বরং ওই বোর্ডের অধীনে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরেও এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এসএসসি এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি কাজে জরুরি অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এ সময়েই তাদের কর্মকাণ্ডে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে হয়েছে- এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে! শিক্ষা সচিব সমকালের প্রতিবেদকের কাছে যদিও বলেছেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক থাকলে পরীক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের কথা হলো, শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাই।