ক্যান্সার মানেই মারাত্মক ব্যাধি ও আতঙ্কের নাম। এ আতঙ্কে যুক্ত হয়েছে স্তন ক্যান্সার। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার এখন সর্বাধিক। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। অজ্ঞতা, অপচিকিৎসা, কুসংস্কার ইত্যাদি কারণেই এ রোগে মৃত্যু ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। এ রোগ বিষয়ে সতর্ক থাকা সবার জন্য জরুরি।
বেশিরভাগ স্তন ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে কিছু বিষয়কে স্তন ক্যান্সারের জন্য দায়ী বলে বিবেচনা করা হয়। এক. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়; দুই. পরিবারে যদি অল্প বয়সে মা, খালা, বোনের স্তন ক্যান্সার থাকে; তিন. জিনগত পরিবর্তন; চার. অল্প বয়সে (১২ বছর) মাসিক শুরু হওয়া; পাঁচ. বেশি বয়সে (৫৫ বছর) মাসিক বন্ধ হওয়া; ছয়. অধিক বয়সে (৩০ বছর) প্রথম বাচ্চা গ্রহণ অথবা সন্তান না হওয়া; সাত. সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো; আট. স্থূলাকার শরীর; আট. শারীরিক পরিশ্রম না করা; নয়. ম্যামোগ্রাফিতে স্তনের ঘনত্ব (ডেনসিটি) বেশি থাকা; দশ. আগে বক্ষদেশে রেডিওথেরাপি বা বিকিরণ চিকিৎসা নিলে।
স্তন ক্যান্সারের বেশ কিছু উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত স্তনে কোনো চাকা বা পিণ্ডের উপস্থিতিই স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক বা প্রথম লক্ষণ। স্তনের পাশাপাশি বগলেও চাকা হতে পারে। এমনকি শুধু বগলে চাকা নিয়েও স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হতে পারে। আবার স্তনের বোঁটা (নিপল) ভেতরের দিকে ঢুকে যেতে ও বোঁটা থেকে রক্ত নির্গত হতে পারে। আবার স্তনের বোঁটায় একজিমার মতো ঘা হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে স্তনের চাকা বক্ষের সঙ্গে বা ওপরের চামড়ার সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকতে পারে। আবার চামড়ায় ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। স্তনের ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য স্থানে চলে গেলে অর্থাৎ ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়লে কাশি, শ্বাসকষ্ট, কাশির সঙ্গে রক্ত; হাড়ে ছড়িয়ে গেলে প্রচণ্ড ব্যথা, হাড় ভেঙে যাওয়া; মাথায় চলে গেলে বমি, মাথাব্যথা, প্যারালাইসিস- এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ পর্যায়ে চিকিৎসা করে রোগী সুস্থ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।
স্তন ক্যান্সারের সব চিকিৎসা আমাদের দেশেই রয়েছে। এ চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টারগেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি। তবে সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা একজন রোগীর দরকার হয় না। এটি নির্ভর করে রোগের বিস্তৃতি ও টিউমারের চরিত্র বা ধরনের ওপর।
সার্জারি :অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে সার্জারি করা উচিত। সার্জন কী ধরনের অপারেশন করবেন সে সিদ্ধান্ত রোগীর সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়। সম্পূর্ণ স্তন না কেটে অর্থাৎ শুধু টিউমার ফেলে দিয়েও দৈহিক সৌন্দর্য বজায় রেখে সার্জারি করা যায়।
কেমোথেরাপি :এসব রোগীর কেমোথেরাপি নিয়ে অনেক প্রশ্ন এবং ভয়। সাধারণত স্যালাইনের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এ থেরাপির অবশ্যই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা চিকিৎসাযোগ্য। যত্রতত্র এ থেরাপি না নিয়ে অবশ্যই একজন ক্যান্সার চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।
রেডিওথেরাপি :সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মেশিনের মাধ্যমে অপারেশনের স্থানে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটি ব্যাথামুক্ত ব্যবস্থা। সব স্তন ক্যান্সারের রোগীর এ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে স্তন না কেটে শুধু টিউমার অপসারণ করা হলে রেডিওথেরাপি বাধ্যতামূলক।
হরমোন থেরাপি :এটি মুখে খাবার ওষুধ। সাধারণত ৫-১০ বছর পর্যন্ত এ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। বায়োপসির মাধ্যমে হরমোন থেরাপি কার্যকর কিনা, তা জানা যায়।
টারগেটেড ও ইমিউনোথেরাপি :এগুলো স্তন ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা। তবে সব স্তন ক্যান্সারের রোগীর এ চিকিৎসা দরকার হয় না। এ ব্যবস্থা অনেক ব্যয়বহুল। সাধারণত স্তনে কোনো চাকা বা পিণ্ডের উপস্থিতি সন্দেহ হলে চিকিৎসকরা শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষাসহ আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করেন। মনে রাখতে হবে, স্তনে বেশিরভাগ চাকা বা পিণ্ডই কিন্তু ক্যান্সার নয়। বিশেষ করে টিনএজ মেয়েদের বেলায় এটি মনে রাখতে হবে। তবে এ রকম কিছু অনুভূত হলে শুরুতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। শুরুতে রোগ শনাক্ত করতে পারলে সম্পূূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব। সাধারণত আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ম্যামোগ্রাফি, এমআরআই, হিস্টো প্যাথলজিক্যাল ডায়াগনোসিসের মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার নিশ্চিত করা হয়। এর পর এ রোগের বিস্তৃতি কতদূর বা কোন স্তরে রয়েছে, তা বুঝতে আরও কিছু পরীক্ষা করা হয়। স্তন ক্যান্সারের স্ট্ক্রিনিং হলো উপসর্গ হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা। স্ট্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হলে চিকিৎসার ফলাফল ভালো হয়।
অক্টোবর মাসকে পৃথিবীব্যাপী স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এই সচেতনতার মাসে নিজেই স্তন পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়মানুযায়ী মাসে একবার পরীক্ষা করে কোনো অস্বাভাবিকতা মনে হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এ ছাড়া স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে এ রোগ থেকে নিরাপদ থাকা যায়। তবে যদি স্তন ক্যান্সার হয়েই যায়, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্ত হলে ৯৮ শতাংশ আক্রান্তের সুস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউড ও হাসপাতাল