প্রথমবার যখন থানা সদরের স্টেশনে ট্রেনে চেপেছি, তখন ঢাকার সঙ্গে নেত্রকোনা জেলা ও তদসংলগ্ন হাওর অঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগটা ছিল খুবই মন্থর ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যদিও এ অঞ্চলের ধান, পাট, মাছ ও সরিষার বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় নিয়ে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২৮ সালের ভেতর মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন বিস্তৃত হয়েছিল। ২০১২ সাল অবধি ঢাকা থেকে একটা ট্রেন অবশ্য নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে আসতে দেখেছি। অনেক সময় সে ট্রেনে যাত্রীর জন্য বগির সংখ্যা থাকত খুব কম। ট্রেনে মালপত্রের বগির আধিক্য ছিল। হাওরের জ্যান্ত জিয়ল মাছের ড্রাম এবং বরফচাপা মাছের টুপরি সেসব বগিতে তোলার সময় মোহনগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ভিজে যেত। সেই ট্রেনের বাইরে ময়মনসিংহ ও মোহনগঞ্জে মন্থর গতির দু-একটি লোকাল ট্রেনের আসা-যাওয়া ছিল। কিন্তু '১০টার গাড়ি কয়টায় আসে'- এমন নীতিতে চলা ট্রেনের ছিল না তেমন গতি। 
২০১৩ সালের ৩০ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ অবধি হাওর এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করল। নেত্রকোনা জেলা ও তদসংলগ্ন ভাটি অঞ্চলের লোকজন বর্তমান সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ এ কারণে যে, তারা হাওর এক্সপ্রেসের পর মহুয়া কমিউটার ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস নামে আরও দুটি ট্রেন পেয়েছে। এতে ঢাকার সঙ্গে নেত্রকোনা জেলাবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশ গতি এসেছে। মাঝখানে বাড়তি সুবিধা পেল ময়মনসিংহবাসী। এখন নেত্রকোনা জেলার লোকজন রাতের ট্রেনে ওঠে লম্বা ঘুম দিয়ে সকালবেলা কমলাপুর স্টেশনে নামে। সারাদিন ঢাকার কাজ সেরে আবার রাতের ট্রেনে উঠে আরেক ঘুম দিয়ে ভোরবেলা জেলার বিভিন্ন স্টেশনে নামে।
একদিন সড়কপথে বাড়ি যাওয়ার পথে নেত্রকোনা জেলার 'বাংলা' রেলস্টেশনের কাছে থামলাম। ছোট্ট একটি শব্দ বাংলা। কিন্তু অগাধ বিস্তৃতি তার। স্টেশনের নামের ওপর চোখ পড়লেই বুকের ভেতর কেমন জানি একটা শিহরণ বয়ে যায়। সেই শিহরণে থাকে বাংলার রূপ-মাধুর্য আর মাতৃভাষা ও স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য সুদীর্ঘ সংগ্রামে নজিরবিহীন রক্তাক্ত বিসর্জন আর সল্ফ্ভ্রমহানির ক্ষত। একাত্তরের ৭ মার্চে উত্তাল জনসমুদ্রে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণেও 'বাংলা' বারংবার উচ্চারিত হয়েছিল। ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য 'বাংলা'র চেয়ে মধুর ও শক্তিশালী শব্দ যে আমাদের অভিধানে আর নেই। বাংলাদেশে আর কোথাও বাংলা নামে কোনো রেলস্টেশন আছে কিনা, আমার জানা নেই। তো, প্রায় জনাকীর্ণ সেই বাংলা স্টেশনে একজনের কাছে জানতে চাইলাম এখানে কোন কোন ট্রেন থামে। লোকটি মুখ কালো করে বললেন, এই বাংলায় ট্রেন থামে না। এ কেমন কথা! এখানে কোনো ভালো ট্রেন থামে না বিধায় লোকটি মনঃকষ্টে এমনটা বলেছেন। গুরুত্বহীনতার কারণে বাংলা কেবল একজন বুকিং ক্লার্ক দিয়ে চলছিল। যিনি দায়িত্বে আছেন সম্প্রতি তিনি জানালেন, বাংলা স্টেশন দু'বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কেবল দুটি লোকাল ট্রেন নিয়ম রক্ষার্থে এখানে একটু থামে।
অনেকবার ঢাকা থেকে এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে বাড়িতে আসা-যাওয়া করেছি। ট্রেন বাংলা স্টেশনে থামেনি। প্রতিবার সেই স্টেশন অতিক্রম করার সময় ট্রেনের জানালা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের গায়ে লেখা বড্ড বিবর্ণ 'বাংলা' লেখাটার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। বাংলা লেখাটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়ার পর মনে হয়েছে যে, শব্দটি উপেক্ষা করে এসেছি তার অবস্থান যে আমাদের অস্তিত্বের শিকড়ে। নেই কেবল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বোধ আর মননে। বাংলার রূপ, ঐতিহ্য আর সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিচ্ছবিতে দৃষ্টিনন্দন অবয়ব দিয়ে স্টেশনটিকে সচল রেখে এখানে সব ট্রেন থামার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কাজটি কি খুব কঠিন?

 লেখক ও নির্মাতা