মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় বর্বর পাকিস্তানি সেপাইরা বাঙালির 'মুসলমানিত্ব' পরীক্ষা করত। ধর্মের এই নগ্ন রাজনৈতিক ব্যবহারের বিপরীতে স্বাধীন বাংলাদেশের নীতিকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয় ধর্মনিরপেক্ষতা। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায়ন-সংক্রান্ত স্পষ্ট সিদ্ধান্তের অভাব ছিল। তাই, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। সংবিধান প্রণয়ন সম্পন্ন হওয়ার আগেই এ আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চেহারা যে ধর্মনিরপেক্ষই হবে- সে বিষয়ে বুদ্ধিজীবীরা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ আজও মীমাংসিত নয়। বরং, তৎকালীন অবৈধ সরকারের সাংবিধানিক সংশোধনী বহাল থাকায় এ সমস্যা জটিল রূপ ধারণ করেছে। 
বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক আলী আনোয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের মাধ্যমে আয়োজন করেন 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বিষয়ক তিন দিনব্যাপী এক সেমিনারের। ১৯৭২ সালের ১৯, ২০ ও ২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে দেশের প্রাগ্রসর বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থী সমাজ অংশগ্রহণ করেন। তাদের অনেকেই আজও জীবিত। কেউ কেউ শিকার হয়েছেন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর প্রতিরোধহীন নির্মম আক্রমণের। 
পরবর্তীকালে সেই যুগান্তকারী সেমিনারের মূল প্রবন্ধগুলোসহ অংশগ্রহণকারীদের আলোচনা-প্রতিআলোচনার সম্পাদিত সারসংক্ষেপ বই আকারে লিপিবদ্ধ করেন আলী আনোয়ার। ১৯৭৩ সালে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' নামে এ বই প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি, তৎকালীন মহাপরিচালক মযহারুল ইসলামের আগ্রহে। এর পর বইটি গুরুত্ব বিবেচনায় বিপিএল সম্ভবত ২০১৫ সালে নতুনভাবে প্রকাশ করে। একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের বৈষম্যপূর্ণ আধিপত্যবাদী অমানবিক ব্যবস্থা ও অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আবির্ভূত বাংলাদেশের জন্য অতি প্রাসঙ্গিক এই সুবিস্তৃত আলোচনা ও বই প্রকাশের ঘটনা সেটিই প্রথম। আলী আনোয়ার, খান সারওয়ার মুরশিদ ছাড়াও সনৎকুমার সাহা, কাজী জোন হোসেন, রমেন্দ্রনাথ ঘোষ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, এবনে গোলাম সামাদ, গোলাম মুরশিদ, অসিত রায় চৌধুরী, সালাহ্‌উদ্দীন আহমদ, কাজী হাসিবুল হোসেন, মফিজ উদ্দীন আহমদ, আব্দুল খালেক, চৌধুরী জুলফিকার মতিনসহ অনেক চিন্তাবিদের মত-দ্বিমত বইটিতে স্থান পেয়েছে। এই বাস্তব আলাপপ্রসূত বইটি ব্যবহূত হতে পারত ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ নির্মাণের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশল নির্ধারণের অন্যতম সূত্র হিসেবে।
আফসোসের বিষয়, ইতিহাসের 'প্যারাডক্স' থেকে আমাদের মুক্তিলাভ সম্ভব হয়নি। আমরা আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছি 'ধর্মনিরপেক্ষতা'। অথচ একে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারিনি। এমনকি আলী আনোয়ারদের শুরু করা অনিবার্য আলাপ অব্যাহত রাখার কোনোরূপ পরিবেশ পর্যন্ত বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। হেঁটেছি বরং উল্টোদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। তার ফলে, আজ লজ্জাবনত হয়ে ধর্মের অপমান ও মানবতার পতনের সামনে অবিকল্প এক অন্ধগলির শেষ মাথায় চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকাই আমাদের নিয়তি হয়ে উঠেছে।
'ধর্মনিরপেক্ষতা'র উপসংহারে খান সারওয়ার মুরশিদ লিখেছেন, "সমাজে মানুষের দীর্ঘদিনের আচরণে ও অভীপ্সায় স্বাধীন চিন্তার ঐতিহ্য গড়ে না উঠলে সেই ঐতিহ্য গড়ে তোলার প্রয়াস চাই।... বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সমাজকে প্রথাবদ্ধ চিন্তার হাত থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে নতুন করে ভাবতে, কল্পনা করতে, দুঃসাহসিক কর্মোদ্যোগে অংশগ্রহণ করতে উদ্দীপিত করা, সামাজিক মুক্তিকে প্রথমে মানসমুক্তির মধ্য দিয়ে সূচিত করা।" দুঃখের বিষয়, আমাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও এ দায়িত্ব পালন করেনি। পালন করেনি আমাদের দু-দুটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটিও। বরং উল্টো কাজটিই হয়ে চলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া, পাঠ্যক্রম বিকৃতকরণ, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তা চর্চায় কালাকানুন আরোপ ইত্যাদির ভেতর দিয়ে।
আমাদের হতাশা এ কারণে গভীর যে, স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে এরূপ অধঃপতন ঠেকানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এর ফলে শিক্ষার সংখ্যাগত উন্নতি হলেও সমাজে ধর্মাচরণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ভিন্নতার প্রতি সহিষ্ণুতা বিকাশের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এরশাদ সরকারের 'রাষ্ট্রধর্ম' কাঠামোগতভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মকে অস্তিত্বের সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম বহাল রেখে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার মতো জটিল অলীক চিন্তা আর হয় না। জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন বর্তমান সরকারের আপাত কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দুর্গাপূজা উৎসব ম্লান করে দিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক সমাজের অন্যায়-নিপীড়নের ঘটনাই এ কথা প্রমাণ করে। 
তবে, এ কথাও মনে রাখতে হবে, বাঙালি জাতির ধর্মীয় বৈচিত্র্য উদযাপন করতে হলে কেবল সুস্পষ্ট কাঠামোগত অবস্থানই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনগণের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষা বিস্তারের প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ। 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র সম্পাদকীয় ভূমিকায় আলী আনোয়ার ১৯৭২ সালেই লিখেছেন, 'ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝায় এবং আমাদের দেশে তা কী রূপ নেবে বা নেওয়া উচিত এ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে।' প্রয়োজন আছে 'সম্প্রদায়' ও 'সাম্প্রদায়িকতা'র পার্থক্য স্পষ্টীকরণের। আজ বেদনার সঙ্গে বলতে হয়, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও এ জাতীয় মুক্ত আলোচনার আয়োজন ও সুযোগ প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, অযৌক্তিক উদ্ভট আরোপিত সিদ্ধান্ত প্রচারের মাইক বাঙালির পরিবারের ভেতরে পর্যন্ত প্রবেশ করেছে। মানুষ ধরেই নিচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মহীনতা! তাই হয়তো বৃহত্তর জনসাধারণের মন রক্ষা করতে সংবিধানে অবৈধ সরকার কর্তৃক সংযোজিত 'রাষ্ট্রধর্ম' সম্পর্কে আলাপ করতেও আমাদের বুক কাঁপে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও; পুলিশ বাহিনীর দক্ষতার উন্নতি হলেও; গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগের কমিটি সক্রিয় থাকলেও, ইসলামের অনুসারী নন এমন নাগরিকদের বারবার জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার হওয়ার অনেক পরে আমরা তাদের পাশে সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়াতে পারি মাত্র। 
আমরা কেন সামাজিক শিক্ষার প্রধান মাধ্যম আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিচর্চার পথ মুক্ত রেখে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক জনশিক্ষা বিস্তৃত করার বদলে উল্টো সংকীর্ণ করে ফেলে কেবলই পুঁজি ও ক্ষমতার রাজনীতির নিরিখে অগ্রগতি মাপতে গিয়ে মানুষ ও সমাজের সম্পর্কে দূরত্ব রচনা করলাম- সে প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কথার কথা নয়। এর প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। বস্তুগত উন্নয়ন মোটেই শেষ কথা নয়; প্রধান কথাও নয়। মানুষে-মানুষে বোঝাপড়া এবং শান্তি ও সম্প্রীতি অটুট থাকলে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের পথ আপনিই প্রশস্ত হয়।
কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক