একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের বিষয়টি বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। কেননা, সময়ের বিবর্তনে একে একে একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন বহু আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন অবশিষ্ট যা আছে, তা অতি নগণ্য। বাস্তবে শহর, গ্রাম, মফস্বল কোথাও একান্নবর্তী পরিবারের দেখা পাওয়া যায় না। সর্বত্র পরিবারমাত্রই স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের সন্তানরা। এর বাইরে পরিবারভুক্ত হিসেবে কাউকে গণ্যও করা হয় না। যদি বৃদ্ধ বাবা-মা বেঁচে থাকেন, তাদের নিয়েও ভাইয়ে-ভাইয়ে নানা টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাবা-মায়ের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনীহা দেখায় অনেক সন্তান। তবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নিম্নশ্রেণির পরিবারে শত কষ্টে হলেও বাবা-মাকে ত্যাগ না করে সন্তানরা সঙ্গেই রাখে। শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এটি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য তো বটেই, পাশাপাশি সমাজের রল্প্রেব্দ-রল্প্রেব্দ যে আত্মকেন্দ্রিকতা ক্রমাগত তীব্র আকার ধারণ করে চলেছে, তার প্রভাবই মূলত দায়ী। মানুষের সমষ্টিগত ভাবনার জগৎ বলে বাস্তবে এখন আর কিছু নেই। সবাই যার যার-তার তার। এ জন্য ব্যক্তিকে অবশ্য এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সমস্যার মূলে ব্যবস্থা। আমরা কোন ব্যবস্থার অধীনে- সেটা অনুধাবন করতে না পারলে সমাধানের পথ কিন্তু খুঁজে পাব না। তাই ব্যবস্থাটাকে চিহ্নিত করে তা পরিবর্তন করা ব্যতীত আমাদের সামনে সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের কোনো দিশা নেই।

একান্নবর্তী পরিবার মানেই যে আদর্শ পরিবার, সেটা কিন্তু নয়। একান্নবর্তী পরিবারে নিপীড়ন, যন্ত্রণা, হতাশা, বৈষম্য ইত্যাদি খুবই পরিচিত বিষয়। একই পরিবারের সব সদস্যের আয়-উপার্জন সমান হয় না। কারও বেশি কারও কম। এই আয়ের কমবেশিতে শ্রেণি অসমতা বৈষম্যের জন্ম দেয়। পরিবারের কর্তৃত্ব সে-ই লাভ করে যে সর্বোচ্চ আয় করে। তারই বশবর্তী হতে হয় অন্যদের। এ ছাড়া পরিবারে যদি কোনো বিধবা মা ও বোন থাকে তবে তাদের গৃহকর্মীর মতো সংসারের সব কাজের ভার বহন করতে হয়। সবচেয়ে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয় সেসব নারীর, যাদের স্বামীর আয়-উপার্জন স্বল্প। সংসারে তাদের অত্যন্ত অমর্যাদাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। কেবল নারীদেরই নয়, সেসব পুরুষ সদস্যেরও, যাদের আয়-রোজগার স্বল্প। একই পরিবারভুক্ত হওয়ার পরও নানা ক্ষেত্রে পরিবারের ধনী-নির্ধন বৈষম্য প্রকাশ পায়।

একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি সুদীর্ঘকাল আমাদের বঙ্গদেশে বলবৎ ছিল। পরিবার থেকে পৃথক হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। তাই বৈষম্যপূর্ণ হলেও একান্নবর্তী পরিবার দীর্ঘ মেয়াদে টিকে ছিল। খাওয়া-দাওয়ার ভিন্নতার পাশাপাশি আয়েশ-বিলাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, সন্তানদের শিক্ষাঙ্গনের ভিন্নতাও অতি সাধারণ বিষয়। এখনও যদি কোনো একান্নবর্তী পরিবার থেকে থাকে, তবে সেখানেও একই চিত্র দেখা যাবে। শ্রেণি-বৈষম্য আমাদের সমাজে যেমন বিদ্যমান, একইভাবে যৌথ পরিবারেও সেটা বিলক্ষণ দেখা যায়। যৌথ পরিবারের কর্তার স্ত্রীর পক্ষের আত্মীয়রা যেভাবে আপ্যায়িত ও সম্মানিত হয়; অন্যদের ক্ষেত্রে অর্থাৎ ওই পরিবারের স্বল্প আয়ের সদস্যদের ক্ষেত্রে সেটা হয় সম্পূূর্ণ বিপরীত। নিজেরাই যেখানে সম্মান ও মর্যাদাহীন, সেখানে স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের সম্মান-মর্যাদার বিষয়টি তো ভাবারই অবকাশ নেই।

আমার দেখা একটি যৌথ পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। আমি তখন কিশোর। আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি পরিবারে সাত ভাই, চার বোন এবং তাদের বাবা-মা। ছোট তিন ভাই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। অপর তিন বোন স্কুল-কলেজগামী। যে চার ভাই চাকরি করতেন তাদের দেখতাম সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিদিন হাতে করে পরিবারের সব সদস্যের জন্য ফলমূল, নানা পদের খাবার নিয়ে বাসায় ফিরতেন। পরিমাণেও ছিল যথেষ্ট। অথচ ওই পরিবারের ছেলেরা একে একে বিয়ে করার পর যৌথ ওই সংসারে বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে। চাকরিজীবী চার ভাই কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন হাতে করে খাবারের প্যাকেট আনতেন বটে তবে পরিমাণে এতই নগণ্য, সে খাবার দু-তিনজনের অতিরিক্ত নয়। অর্থাৎ বিয়ের পর ভাইয়েরা সামষ্টিক ভাবনা থেকে একে একে সরে এসে আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবারে থাকলেও একান্নবর্তী রান্না তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হতো না। তাই উপার্জনকারী ওই চার ভাই এবং তাদের স্ত্রীরা মাছ-মাংস আলাদাভাবে রান্না করে নিজেদের ঘরে তুলে রাখত এবং স্বামী-স্ত্রী ও নিজ সন্তানদের নিয়ে সেই পৃথক রান্না খেত। এতে পরিবারটির ভেতরে নানা ক্ষোভ-হতাশার কথা শুনতাম। কিন্তু সাহস করে এর বিরুদ্ধে কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখিনি। আদর্শিক ওই যৌথ পরিবারটিতে বৈষম্য এতটাই প্রকট হয়ে পড়ে যে, প্রায়ই এ নিয়ে নানা ক্ষোভের কথা শুনতাম। প্রকৃত গৃহকর্তা পিতা-মাতাও এ নিয়ে মনোকষ্টে ভুগতেন বটে তবে উপার্জনকারী ছেলেদের বৈষম্যপূর্ণ আচার-আচরণ নিয়ে কিছু বলতে সাহস করতেন না। যে পরিবারে সমষ্টিগত একটি জগৎ তৈরি হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে সেটি একে একে ভেঙে পড়ল। পরস্পরের হৃদ্য, আন্তরিকতাও পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। পরিণতিতে পরিবারের মধ্যে পৃথক দুই পক্ষ গড়ে ওঠে। এক পক্ষ সুবিধাভোগী অপর পক্ষ সুবিধাবঞ্চিত। তীব্র টানাপোড়েনের পরও পরিবারটি ভাঙেনি বৃদ্ধ পিতা-মাতার কারণে। পিতার মৃত্যুর পর অধিক উপার্জনকারী ভাইয়েরা পাশের এলাকায় নতুন আবাসে চলে যায়। মা-বোনসহ স্বল্প আয়ের ভাই এবং বেকার ভাই পুরোনো আবাসে থেকে যায়। পূর্বের একান্নবর্তী পরিবারের অর্থনৈতিক জৌলুস ক্রমে ম্লান হয়ে নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে পরিণত হয়। অথচ অবস্থাপন্ন ভাইয়েরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত রূপে নিজেদের শ্রেণিগত দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। এমন নজির আরও অনেক আছে।

যৌথ পরিবার কখনোই বৈষম্যহীন ছিল না। পরিবারের ভেতরে মন কষাকষি, মনোমালিন্য, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বৈরিতা, বৈষম্য, দুঃখ-হতাশা, অমানবিকতা বিরাজ করত। শ্রেণি-বৈষম্যপূর্ণ সমাজের প্রভাবমুক্ত ছিল না কোনো যৌথ পরিবার। পরিবার তো সমাজেরই অধীন। পরিবারের সদস্যরা যতই নিকটবর্তী হোক না কেন, শ্রেণিগত অবস্থান তাদের দূরবর্তী করে দেয়। সৃষ্টি করে পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার। এখনকার একক পরিবারগুলোতে সদস্য সংখ্যা তিন-চারজনের অধিক নয়। অথচ আগে প্রতিটি পিতা-মাতার অধিক সন্তানের কারণে একান্নবর্তী পরিবারের পরিসর ছিল বৃহৎ। একটি যৌথ পরিবারে ত্রিশ-চল্লিশজন সদস্য থাকাটাও ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আজ এসব যেন স্মৃতির কাতারভুক্ত হচ্ছে।

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত