সম্প্রতি ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটারপ্রতি ৬৫ থেকে ৮০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির হার ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনে দেশীয় বাজারে মূল্য বৃদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প ছিল না বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, সরকারের এ উপসংহারটি ভ্রমাত্মক। এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসিকে বাড়তি মূল্যের সম্মুখীন হতে হয়। এতে শুধু জুলাই মাসেই বিপিসিকে ৭২০ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছিল। সুতরাং বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিপিসির দুর্ভাবনার বিষয় ছিল। তবে এই ব্যয় মেটাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র সমাধান কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথমত বলা দরকার, ডিজেলের মূল্য যতটুকু বাড়ানো হয়েছে, সেই মূল্য যদি স্থির থাকে তাহলে সরকার ইতোমধ্যে মুনাফা করছে বা বাড়তি আয় করতে শুরু করেছে। অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের ফলে সরকারের আয়ের মাত্রা আরও বাড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে সরকার এক ধরনের পজিটিভ বেনিফিটের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে ভোক্তার ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই বলা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি এবং সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা।
আমরা দেখেছি, ২০১৫ থেকে ২১ সালের মধ্যে বিপিসি প্রায় ৪৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা বাড়তি আয় করেছে। সরকার গত দুই বছরে বিপিসির ২০০০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে। এর পরও বিপিসির হাতে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ থাকার কথা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর সমন্বয় করতে দেশীয় বাজারে দাম না বাড়িয়ে বিপিসি নিজস্ব আয় থেকে বিষয়টি সমন্বয় করতে পারত। এ ছাড়া জ্বালানি তেল আমদানিতে যে আমদানি শুল্ক্ক ও ভ্যাট দেওয়া হয়, তাতে কিঞ্চিৎ ছাড় দিলে বিপিসি বাড়তি মূল্য সমন্বয় করতে পারত।
সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী দেখা যায়, জ্বালানি তেলের আগের মূল্য ধরে ২০২২ সালে সরকারি কোষাগারে বিপিসির আট হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স জমা দেওয়ার কথা। ডিজেলের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের ভ্যাট ও ট্যাক্স-সংক্রান্ত আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং এর থেকে কিয়দংশ ছাড় দেওয়া গেলে চার হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো বিপিসির যে বাড়তি ব্যয়, তা ট্যাক্স ও ভ্যাট কমানোর মাধ্যমে সহজেই সমন্বয় করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হলো, ভ্যাট-ট্যাক্সে ছাড় দিলে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটানো কষ্টকর হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বেশ সন্তোষজনক, ১৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে; যা গত অর্থবছরে ছিল শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। কাজেই কিঞ্চিৎ ছাড় দিলে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এটা অনুমেয় ছিল যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্য একটি সাময়িক পরিস্থিতি। এর কারণ, কভিড-১৯ এর ধাক্কা সামলিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত হয়েছে এবং সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো লক্ষ্যমাত্রার আলোকে জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি না করার কারণে বাড়তি মূল্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক হওয়ার কথা, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার কভিড-পূর্ববর্তী অবস্থানে চলে গেলে এ ধরনের বাড়তি চাহিদা পরিস্থিতি কেটে যাবে এবং তা নিকট ভবিষ্যতেই হওয়ার কথা। সেই সময়কাল পর্যন্ত সরকার বাড়তি ব্যয়টুকু মেটাতে পারত। উপরন্তু সরকার প্রয়োজনবোধে কিছু ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারত। সরকার বিপিসিকে সর্বশেষ ২০১৪ সালে ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। তার পর থেকে বিপিসিকে আর ভর্তুকি নিতে হয়নি। ২০১৪-পরবর্তী বছরগুলোতে বিপিসি বাড়তি আয় করেছে। কাজেই এ বছর কিছুটা ভর্তুকি দিতে পারত সরকার। কিন্তু তা করা হয়নি।

প্রতি বছর সরকারের যে মাত্রায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা থাকে, এর বড় অংশই বাস্তবায়ন হয় না। অথচ এ জন্য অর্থ প্রাক্কলন ধরা থাকে। ২০২১ সালে সরকারের ঘোষিত বাজেট থেকে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা কম এডিবি বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রতি বছরই এভাবে বাজেট কিছুটা অবাস্তবায়িত থেকে যায়। পরবর্তী অর্থবছরে বাজেটের প্রাক্কলন অনুযায়ী যখন পুনর্মূল্যায়ন করা হয় তখন সেখান থেকে অর্থ বেরিয়ে আসে এবং তা অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ থাকে। কাজেই সরকারের হাতে সুযোগ ছিল বাজেটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে জ্বালানি তেলে ব্যয়ের বিষয়টি হাতে রাখা। কিন্তু সরকার তা না করে সবচেয়ে জটিল সিদ্ধান্তটি খুব সহজেই গ্রহণ করল। বাড়তি দামের সম্পূর্ণ দায়ভার চাপানো হলো ভোক্তার ওপর।
আমাদের দেশে স্বাভাবিক মূল্যস্ম্ফীতির প্রভাব আগে থেকেই ছিল। এখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির নানাবিধ প্রতিক্রিয়া বিভিন্নভাবে দেখছি। পরিবহন খাতে ইতোমধ্যে এক ধরনের বিচ্যুতি দেখতে পাচ্ছি। যার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, যা মোটেই কাম্য ছিল না। সরকার চাইলে জ্বালানি তেল আগের মূল্যে পুনর্বহাল এবং বাড়তি ব্যয় মেটাতে এক বা একাধিক বিকল্প উপায় অবলম্বন করতে পারে।
স্বাভাবিক সময়ে ভর্তুকি দিয়ে এ ধরনের সমন্বয় না করাই ভালো। কিন্তু মাত্রই যখন কভিড পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে; সবাই এখনও কাজে ফিরতে পারেনি; মূল্যস্ম্ফীতির প্রভাব রয়েছে মানুষের ওপরে; কাজেই এটা মূল্যবৃদ্ধির উপযুক্ত সময় নয়। আমাদের বাজার স্থিতিশীল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা বজায় রেখে দেশীয় বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হলে তা গ্রহণযোগ্যতা পেত। যেমনটি আমরা ভারতের বাজারে দেখি। ধীরে ধীরে হয়তো বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাও সেভাবে গড়ে উঠবে এবং সরকার দীর্ঘ মেয়াদে ভর্তুকি সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু সে রকম একটি বাজার কাঠামো গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের পরিকাঠামো থাকা দরকার তা এখানে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তাকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি দেওয়া; বৃদ্ধি হলে সে মাত্রায় বৃদ্ধি করা এবং এর থেকে কেউ যাতে বাড়তি সুবিধা নিতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে মূল্য সমন্বয় করে ভারত। সেখানে নির্ধারিত আছে মূল্য কতটুকু বৃদ্ধি পেলে তার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন বা অন্যান্য খাতে কোন অনুপাতে মূল্যের সমন্বয় হবে। সেখানে সংশ্নিষ্ট খাতগুলো শুধু সেই নির্দেশনা পরিপালন করে মাত্র। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের দেশে যখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ আসে তখন পরিবহন বা অন্যান্য খাত তাদের দীর্ঘদিনের যাবতীয় হিসাব চুকানোর চেষ্টায় অবতীর্ণ হয়। আবার যখন মূল্যহ্রাসের প্রসঙ্গ আসে তখন তারা নানা অজুহাতের অবতারণা করে থাকে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক বাজার কাঠামো নিশ্চিত করা এবং মূল্যহ্রাসের সুবিধা ভোক্তাকে পৌঁছে দেওয়া খুবই কষ্টকর। এই বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, নতুবা বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী সবসময় এই সুবিধাগুলো গ্রহণ করবে।
আমাদের দেশে সাধারণ ভোক্তার রাজনৈতিক ক্ষমতা খুবই সীমিত। তাদের পক্ষে 'ভয়েস রেইজ' করে সরকারের কাছে পৌঁছানো এবং সে অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায় করা খুবই কষ্টসাধ্য। কিন্তু এর ভেতরে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া সুবিধা নিচ্ছে এবং ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ হয়তো সেটা চেয়ে চেয়ে দেখছে। এসব জায়গায় সরকারের সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুদৃঢ়করণ এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)