দেশে এক ধরনের উন্নতি যে হয়েছে, সেটা ঠিক। শত বিপদের মধ্যেও ওই উন্নয়ন থেমে নেই; নির্ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সে উন্নতি যে এক বিশেষ প্রকারের, এ সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী একটা সুস্পষ্ট ধারণা আমাদের দিয়েছেন। মন্ত্রীদের বক্তব্য আমাদের শুনতে হয়। না শুনে উপায় থাকে না। চোখ-কান খোলা রাখার দরকার পড়ে না। বক্তব্যগুলো চতুর্দিকে ঘুরতে থাকে। সেসব বক্তব্য সাধারণত আলো দেয় না। এরই মধ্যে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এসেছিল পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্যটি। গত আগস্টে তিনি বলেছেন, 'বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল বৈষম্য বাড়াচ্ছে' এবং 'খুব সহসা যে তা কমবে এমন সম্ভাবনা নেই।' এ ধরনের সত্য কথা গুরুত্বপূর্ণ লোকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল সারাবিশ্বে অত্যন্ত প্রশংসিত; অন্যরা অনুকরণে ভীষণ আগ্রহী; এসব কথাই শুনে আসছি। ওই উন্নয়ন বৈষম্য বৃদ্ধি অধিকাংশ মানুষের দুঃখ বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে- এ কথাটা অনেক জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকেও সচরাচর শুনতে পাই না। পরিকল্পনামন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমাদের মনে পড়ে, উন্নয়ন পাকিস্তান আমলেও বিস্তর হয়েছে। কিন্তু ওই উন্নতি বৈষম্যমূলক ছিল বলেই তার বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধে যেতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। ভয়ংকর রকমের বিপদ মাথায় নিয়ে। তবে পরিকল্পনামন্ত্রীর ওই বক্তব্য যে তার কাছের লোকদের কানে পৌঁছাবে এবং উন্নয়ন নিয়ে চিন্তিত করবে; এমন ভরসা একেবারেই নেই।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যে দেশের সবার জন্য সুখ বয়ে আনেনি- সেটা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। উন্নয়ন বেড়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান তার সঙ্গে যে পাল্লা দিয়ে বাড়বে, তেমনটি ঘটেনি। অথচ মেহনতিদের শ্রমের ওপর ভর করেই সৌধটি দাঁড়িয়েছে। করোনাকালে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে গেছে। কিন্তু গ্রামে গিয়ে কী করছে? আয়-উপার্জনের কী বন্দোবস্ত? একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। পাবনা অঞ্চলের এক দম্পতি ঢাকা শহরে কাজ করতেন পোশাক কারখানায়। কাজ হারিয়ে গ্রামে ফেরত গেছেন তারা। গ্রামে গিয়ে কাজ না পেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান দু'জনে একসঙ্গে। ওদিকে আমাদের জন্য মহাসমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে বন্যা। বন্যার অভিশাপ নিরসনের ব্যাপারে উন্নতি বিন্দুমাত্র কার্যকর হয়নি। বন্যা ফি বছর হয়, সমাধানের দাবি ওঠে। তারপর যেই সেই। চাপা পড়ে যায় বিষয়টি- এটাই বাস্তবতা। এ বছরেও বন্যা হয়েছে। বহু মানুষ গৃহহীন। জলাবদ্ধতাও ঘটেছে। নিম্নাঞ্চলে যেমন, তেমনি বড় শহরেও, বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহরে।
বন্যার কথা খুব করে বলতেন মওলানা ভাসানী। তিনি কৃষকদের দুর্দশা জানতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৭ নম্বরটি ছিল- 'খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করিয়া দেশকে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষের কবল হইতে রক্ষা করিবার ব্যবস্থা করা হইবে।' ১৯৬৫ সালে ঘোষিত ন্যাপের ১৪ দফা ছিল সারা পাকিস্তানের কর্মসূচি। সেখানেও ১৩ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, 'পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা প্রতিরোধ করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।' বহু কষ্টে পাকিস্তানকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিদায় করা গেছে। কিন্তু গত ৫০ বছরেও বন্যার অভিশাপ আমাদের কাঁধ থেকে নামেনি। প্রধান কারণ, সমস্যাটা বিত্তবানদের স্পর্শ করে না। পাকিস্তান আমলেই এটা পরিস্কার হয়ে যাওয়া উচিত ছিল এবং গিয়েও ছিল- বন্যা সমস্যা মূলত নদীর সমস্যা। যে জন্য ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছিল।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সেই ফারাক্কা কার্যকর করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের জন্য শুস্ক মৌসুমে কম পানি ও বর্ষায় প্লাবনের দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে। মওলানা ভাসানী সমস্যাটির গুরুত্ব কখনও ভোলেননি। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এবং অসুস্থ অবস্থাতেও ফারাক্কা অভিমুখী লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে তিস্তাসহ অন্য নদী নিয়েও বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমরা ভুক্তভোগী কিন্তু এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের তেমন দুশ্চিন্তা দেখা যায় না। ওদিকে বর্ষা এলেই নদীভাঙন শুরু হয়ে যায়। শত শত মানুষ গৃহহীন হয়। জমি কমে আসে। আবার গ্রীষ্ফ্মের সময় অনেক এলাকায় দেখা দেয় নিদারুণ খরা। খাবার পানির আকাল পড়ে। উন্নতির উৎসবের নিচে হারিয়ে যায় বিপন্ন মানুষের উদ্বেগ ও আর্তনাদ।
তবে উন্নতির যথেচ্ছাচারের সংবাদ ও প্রমাণ দেখা যাচ্ছে যত্রতত্র। যেমন নির্বাচনে। অভিনবত্বের দিক থেকে আমাদের গত দুটি জাতীয় নির্বাচনই অসামান্য; তবে দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইউপি নির্বাচনে দেখা গেল আরেক ধাপ উন্নতি। ভোট কারচুপি, ভোট কেনাবেচা আগে শুনেছি। উন্নত পরিস্থিতিতে এবার খবর পাওয়া গেল নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যাপক সহিংসতার। দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচনে বিএনপি মাঠে নেই। সংঘাত-সহিংসতা হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ধাপে এই নির্বাচন হয়েছে। আরও ধাপ বাকি। সামনের নির্বাচন নিয়েও সহিংসতার আশঙ্কা প্রকট। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধি ও অধিকারের ভূমি ক্রমাগত অসমতলের বিরূপ ফলই দেখা যাচ্ছে।
আগামীতে দেশে আরও কত রকমের উন্নতি হবে, কে জানে! তবে প্রশ্ন থাকবে- পুঁজিবাদের এই যে স্রোত; একে রুধবে এখন কোন বাঁধ? না, পুঁজিবাদী বাঁধ দিয়ে পুঁজিবাদের প্লাবন রোধ করা যাবে না; সামাজিক মালিকানার দিকে যেতে হবে। খুব জরুরিভাবে সেই ব্যবস্থা দরকার হবে, যাতে জনপ্রতিনিধিরা টাকার জোরে নির্বাচিত হবেন না। তাদের একমাত্র যোগ্যতা হবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা; অন্য কিছু নয়। কিন্তু তেমনটি ঘটার আশু কোনো সম্ভাবনা কি দেখা যাচ্ছে? ব্যাপার-স্যাপার মনে হবে কৌতুকের, কিন্তু আসলেই কি তাই?
নিরাপত্তার কথা বলছিলাম। নানা দিক থেকেই আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি। চাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বলা হচ্ছে, সিন্ডিকেট দায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে- সিন্ডিকেটকে কি সরকার চেনে না? সিন্ডিকেট ভাঙা হচ্ছে না কেন? এমনকি ব্যক্তিগত আলাপও তো দেখছি এখন অনিরাপদ। টেলিফোনে আড়িপাতা হচ্ছে। করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের নানা চিত্র উঠে এসেছে। অনিয়ম-দুর্নীতি ও দায়িত্বশীল কারও কারও স্বেচ্ছাচারিতা প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- এর শেষ কোথায়?
বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত ঘটে। কিন্তু যা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণ তা এই যে, বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই তো কিছুদিন আগে রাজশাহীতে বরযাত্রীরা ঝড়-বৃষ্টিতে পড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন টিনের এক চালের নিচে। এক আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন। দিনাজপুর এলাকাতে মাঠে ফুটবল খেলছিল কিশোররা। বজ্রাঘাতে ৪ জন মারা গেছে। ৩ জন মাছ ধরছিল বৃষ্টিতে। বজ্রাঘাত তাদের প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে। এ-ই সব নয়; দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি ঘটনা। মূল কথাটা হলো, বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটা বড় কারণ বৃক্ষনিধন। গাছ যে কতটা উপকারী, সেটা অনেকেই বোঝেন না। নির্বিচারে চলছে বৃক্ষনিধন। এ দায়টা কার? এক কথায় বলতে গেলে দায় পুঁজিবাদী উন্নয়নের। এই উন্নয়নকারীদের বিরুদ্ধে ভালো একটা অবস্থান নিয়েছেন দেখলাম কলকাতা হাইকোর্ট। হাইকোর্ট ভারতের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে ৪০ কোটি রুপি জরিমানা করেছেন ৬০০ গাছ কেটে ফেলার কারণে। কলকাতা শহরের একেবারে কেন্দ্রে একটি খোলা জায়গাতে বহুতল আবাসন নির্মাণের অছিলায় প্রতিষ্ঠানটি ওই ৬০০ বৃক্ষ নিধন করেছিল। হাইকোর্টের হিসাবে এতে ক্ষতি হয়েছে ৪০ কোটি রুপি। হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, জরিমানা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার কাজে। এটা একটা ভালো দৃষ্টান্ত। প্রয়োজনীয় বার্তা প্রেরণ। কেবল এতে যে কাজ হবে, তা তো নয়। বদলানো চাই উন্নয়নের পুঁজিবাদী ধারণা ও ধারাকেই।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক