ঘটনা স্থান ১ : জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা জনৈক যাত্রীর পাসপোর্ট যাচাইয়ের সময় দেখলেন যে তার নাম 'এমডি' দিয়ে শুরু। এ সময় তিনি যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি মেডিকেল ডক্টর কিনা; যাত্রী না সূচক জবাব দিলেন। 'এমডি' এর এমন ব্যবহার দেখে তিনি অবাক হলেন। উল্লেখ্য, সে দেশে মেডিকেল ডক্টরকে 'এমডি' বলে।
ঘটনা স্থান ২ : শাহজালাল মেডিকেল সেন্টার, টাওয়ার হ্যামলেটস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

একজন ইংরেজ জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ডাক্তার রোগী দেখার সময় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মিডল নেম বা নামের মধ্যাংশ উহ্য রেখে ফার্স্ট নেম, গিভেন নেম বা প্রদত্ত নাম এবং সারনেম, লাস্ট নেম বা বংশগত নাম সমন্বয়ে জনৈক মোহাম্মদ ইসলামকে ডাকলে কয়েকজন মোহাম্মদ ইসলাম হাজির হলেন। নথিপত্র ঘেঁটে তিনি জানতে পারেন, তাদের কারও নাম মোহাম্মদ কবিরুল ইসলাম, কারও নাম মোহাম্মাদ সবিরুল ইসলাম এবং কারও নাম মোহাম্মদ দবিরুল ইসলাম। তাদের মিডল নেম আলাদা আলাদা হলেও তাদের সবার ফার্স্ট নেম এবং বংশগত নাম একই। তিনি আরও জানলেন, তাদের কেউ একই বংশের নয়। এবং এদের অনেকেরই জন্মদিন ১ জানুয়ারি বা ৩১ জানুয়ারি- বিষয়টিতে তিনি খুবই অবাক হলেন।
ঘটনা স্থান ৩ :অকল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নিউজিল্যান্ড
একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা একই সঙ্গে আসা জনৈক ভদ্রলোক, তার বাবা-মাসহ তিনজন যাত্রীর পাসপোর্ট যাচাইয়ের সময় দেখলেন যে ভদ্রলোকের বংশগত নাম 'ইসলাম'-এর সঙ্গে তার পিতার বংশগত নাম 'উদ্দিন'-এর মিল নেই; আবার তার মায়ের বংশগত নাম 'খাতুন'-এর সঙ্গে ভদ্রলোকের নিজের এবং তার পিতার বংশগত নামের মিল নেই। একই পরিবারে ভিন্ন ভিন্ন বংশগত নামের এ বিষয়টি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে অবাক করে।
এবার ঘটনাগুলো বিশ্নেষণ করা যাক।
প্রথম ঘটনায় 'এমডি' ব্যবহারে বিড়ম্বনার বিষয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের অনেক মুসলমান তাদের ছেলেদের নামে 'মোহাম্মদ' নামটির পুরোটা ব্যবহার না করে বাংলায় 'মো.' এবং ইংরেজিতে 'এমডি' লিখে থাকে। এটি অনেককাল থেকেই এ দেশে হয়ে আসছে। কিন্তু এরূপ সংক্ষিপ্ত ব্যবহারের কারণ জানা যায় না। বিদেশিরা না বুঝলেও বাংলাদেশিরা ঠিকই 'মো.' ও 'এমডি'কে 'মোহাম্মদ' পড়ে এবং উচ্চারণ করে। তবে আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নামের এরূপ সংক্ষিপ্তকরণ কোনো দেশেই কাম্য নয়। এটি সম্ভবত আমাদের বাবা-মা, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, সমাজপতি, মসজিদের ইমাম, নাম নিবন্ধন কর্মকর্তা বা প্রাথমিক শিক্ষক যারা প্রায়ই সন্তানদের নাম রাখেন বা স্কুল রেজিস্টারে নাম ওঠান তারা তাদের অসচেতনতার কারণে এরূপ করে থাকেন। নামের এরূপ সংক্ষিপ্ত ব্যবহারের কারণে অনেক দেশেই আমাদের বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়। এরূপ বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের পাসপোর্ট অফিস একবার একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নামের সংক্ষিপ্ত যেমন মোহাম্মদের 'মো.' ও 'এমডি', শেখের 'এসকে', মোছাম্মতের 'এমএসটি'সহ আরও অনেক শব্দ পাসপোর্টে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবে ইদানীং ই-পাসপোর্ট করার সময়ে ওই বিজ্ঞপ্তিটিকে সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় না করায় অনেকেরই এনআইডি কার্ডে ব্যবহূত নামের সংক্ষিপ্ত যেমন 'মো.', 'এমডি', 'এসকে', 'এমএসটি'সহ আরও অনেক শব্দের কারণে পাসপোর্ট পেতে সমস্যা হচ্ছে।
দ্বিতীয় ঘটনায় নামে 'মোহাম্মদ' শব্দ ব্যবহারে বিড়ম্বনার বিষয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের অনেক মুসলমান ছেলেসন্তানদের নামের আগে 'মোহাম্মদ' এবং মেয়েসন্তানদের নামের আগে 'মোছাম্মৎ' শব্দের ব্যবহার করেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা চলে, 'মোহাম্মদ' প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর নাম, যার অর্থ প্রশংসিত এবং 'মোছাম্মৎ' শব্দের অর্থ নাম রাখা হয়েছে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি বিশেষণ হিসেবেও ব্যবহূত হয়। এসব শব্দের পরে মুসলমানরা আরও অন্তত দুটি শব্দ যেমন 'মোহাম্মদ'-এর পরে কবিরুল ইসলাম বা 'মোছাম্মৎ'-এর পরে রাফিয়া খাতুন ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবে তারা কবিরুল ইসলাম বা রাফিয়া খাতুন হিসেবে পরিচিত হন বা তাদের কেউ কেউ আবার আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কাজে নামের আগের 'মোহাম্মদ' বা 'মোছাম্মৎ' শব্দের ব্যবহার করেন না। 'মোহাম্মদ' নামটি প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবেসে বা ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বোঝাতে উপমহাদেশে ব্যবহার হলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান এটিকে নামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন না; তারা নামের মধ্যাংশকে আসল নাম ভাবেন। অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে 'মোহাম্মদ' তাদের ফার্স্ট নেম; কবিরুল, সবিরুল বা দবিরুল তাদের নামের মিডল নেম, যা বাইরের সমাজে প্রায়ই উহ্য থাকে। যেমন প্রেসিডেন্ট ওবামার আনুষ্ঠানিক নাম বারাক হুসেইন ওবামা; এখানে তার মিডল নেম হুসেইন-এর কথা বেশিরভাগ মানুষই জানে না। এ ছাড়া জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ সচেতন না হওয়ার কারণে নিবন্ধনকর্মী বা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকরা স্কুল রেজিস্টারে ছাত্রদের নাম ওঠানোর সময় একটি সহজ জন্মতারিখ যেমন ১ জানুয়ারি, ৩১ জানুয়ারি বা এরূপ কোনোটি দিয়ে দেন।
তৃতীয় ঘটনায় বংশগত নাম ব্যবহারে বিড়ম্বনার বিষয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের অনেক মুসলমান ইদানীং ইচ্ছামতো বংশগত নাম তৈরি করেন। অথচ এটি বংশ পরম্পরায় চলে আসার কথা। ভারতের একজন বিখ্যাত সংবিধানবেত্তা ননী অর্দেশীর পালখিভালার কোনো এক পূর্বপুরুষ পালকির কাজ করতেন, সেই থেকেই তাদের বংশগত নাম পালখিভালা হয়েছিল; পরবর্তী খ্যাতি তাদের বংশগত নাম ব্যবহারে বিচ্যুত করেনি। আমাদের সমাজে অনেক সময় সচেতনতার অভাবে বা কোনো কোনো সময় বংশগত নামে পূর্ববর্তী বংশধরদের পেশার পরিচয় পাওয়া যায় বিধায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অনেককেই বংশগত নাম পরিবর্তন করতে দেখা যায়। আর বংশগত নাম সাধারণত নামের শেষ অংশে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া দু-একজনের নামের শুধু একটি অংশই থাকে; এ ক্ষেত্রে তাদের বিদেশের ভিসা পেতে বা অনলাইনে কোনো ফরম পূরণ অনেক সমস্যায় পড়তে দেখা যায়।
কাজেই বিশ্বায়নের এ যুগে পণ্যের মতো মানুষও বিভিন্ন প্রয়োজনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটে চলেছেন। নামের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা কাটিয়ে তাদের এ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে মানুষের নামের অন্তত ফার্স্ট নেম এবং বংশগত নামের সমন্বয়ে নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত রীতির আলোকে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এ নীতিমালাটি বাবা-মা, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, সমাজপতি, মসজিদের ইমাম, নাম নিবন্ধন কর্মকর্তা বা প্রাথমিক স্কুলশিক্ষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে সন্তানদের সঠিক উপায়ে নাম রাখতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং দেশ-বিদেশে চলাচলকারী মানুষরা নামের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবে।
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়