শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা যেহেতু বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে পিএসসি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন, সেহেতু তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ছাত্রজীবনে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে একই সঙ্গে পথচলা, একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা বয়োজ্যেষ্ঠ, বয়োকনিষ্ঠ ও সমবয়সী সতীর্থরা ১৯৮২, ১৯৮৫ সালের বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন, জুডিশিয়াল ও শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করে সাম্প্রতিককালে অবসর জীবন শুরু করেছি। প্রত্যাশা করি, এক হাজার নম্বরের বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানকৃত আমার সুপ্রিয় (সপ্তম বিসিএস) ব্যাচমেটরা হয়তো নিশ্চয়ই ভুলে যাননি পদোন্নতি, সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমাদের কতটা হতাশা ও বঞ্চনার জায়গা অতিক্রম করতে হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসের নিয়মে আমাদের সময়কালেই অতীতের না পাওয়ার পুঞ্জীভূত বেদনার কিছুটা উপশম হলেও জীবনের পড়ন্ত বিকেলে আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের তীব্র বেদনা অনুভব করি। আগের রেওয়াজমাফিক শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তৃতীয় গ্রেড প্রাপ্য ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড দেওয়ার বিধান রহিত করার কারণে অধ্যাপক পদে পর্যাপ্ত ফিডার সার্ভিস নিয়েও আমরা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম। অর্থাৎ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চাকরি কাঠামোতে সর্বোচ্চ ধাপ তৃতীয় গ্রেডের পরিবর্তে চতুর্থ গ্রেড নির্ধারিত হলো।
শিক্ষা ক্যাডারে কর্মকর্তাদের চাকরি কাঠামোতে ওপরে ওঠার সিঁড়িটিকে অন্যদের তুলনায় সংকুচিত বা খাটো করে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত মাত্র চারটি ধাপে তাদের উপবেশন করার জন্য আসনবিন্যস্ত করা হয়েছে। সেকালে চৌদ্দ থেকে আঠারো বছর প্রভাষক পদে চাকরি করার ক্ষেত্রে তা একটি অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ প্রশাসন, জুডিশিয়াল ক্যাডারসহ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকাঠামোতে ওপরে ওঠার সিঁড়িটি এতটাই সুউচ্চ ও সুপ্রশস্ত হয়েছে তাতে অনেক ধাপ সংরক্ষণ করে সেখানে উপবেশন করার আসনগুলোকে চমৎকার ও আকর্ষণীয় করে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। তাদের কর্মক্ষেত্রে নানা পর্যায়ে ও পরিবেশের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা উপভোগ করে তর তর করে সুউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পথ সুগম করা হয়েছে। তবে কেউ কেউ এমন ভাবতে পারেন, আপনি শিক্ষক হয়েছেন আপনার কর্ম তো কেবল শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা, সেখানে কর্মজীবনের সিঁড়ি এতটা সুউচ্চ হওয়ার প্রয়োজন কি? শিক্ষক হিসেবে আপনার কর্মকাঠামোতে নানা বৈচিত্র্যময় পরিবেশের অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রয়োজনই বা কি? শিক্ষক হিসেবে আপনার ওপরে ওঠার এত স্বপ্নসাধই বা কেন? শিক্ষকরা মনে হয় উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছে। সে ক্ষেত্রে আমার অভিমত হলো, মেধাবী ও সৃজনশীল তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা, সেখানে ধরে রাখা এবং হৃদয়ের সামগ্রী উজাড় করে দান করার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে তার প্রয়োজন আছে। যদি শিক্ষক হন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তৈরির কারিগর। তাদের যথার্থ কারিগর হিসেবে পেতে, ওই কাজের সুনিপুণ শিল্পী বানাতে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের চেয়ে তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদায় খাটো করে রেখে সে কাজটি ভালো রকমের হতে পারে না।
নানা সীমাবদ্ধতার মাঝে আজও শিক্ষকরাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আলো দিয়ে, ছায়া দিয়ে তৈরি করেন। সে ক্ষেত্রে বেতন কাঠামোতে ওই বৈষম্য শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা তথা শিক্ষক সমাজের জন্য অমর্যাদাকর বিবেচনা করি। দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমার প্রশ্ন- আপনারা মেধাবী ও নিবেদিত তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে ও সেখানে ধরে রাখার উপায় খুঁজতে চান। সে ক্ষেত্রে সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেড না দিয়ে এবং একই পদে তাদের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলে সে পেশায় কি মেধাবীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে? তেমনি শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের কর্মকাঠামো ও বেতন কাঠামোর সিঁড়িটি যদি প্রশাসন এবং জুডিশিয়াল ক্যাডারের অনুরূপ নানা ধাপে সুবিন্যস্ত করা না যায়, তাহলে মেধাবী ও নিবেদিত তরুণরা কি সে পেশায় আকর্ষণ অনুভব করবে? শিক্ষক ও শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের প্রতি এমন বৈষম্যমূলক নীতি কী অনাগত ভবিষ্যতে শিক্ষকের মান উন্নয়ন ও দুর্বল শিক্ষার দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলতে বা তা দূরীকরণে সক্ষম হবে? এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত প্রত্যাশা করি।
এ পর্যায়ে শিক্ষকদের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে কিছু কথা। ২০০৩ সালে রাজশাহী কলেজে কর্মকালে একজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মী, যিনি রাজশাহী কলেজে ষাটের দশকের ছাত্র ছিলেন। তার মুখ থেকে জানা ঘটনাটি বর্ণনা করছি। সে সময়ে রাজশাহী কলেজে নিউ হোস্টেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রথিতযশা অধ্যক্ষ অধ্যাপক এমএ হাই (আতফুল হাই শিবলী স্যারের পিতা) অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি মনোনীত করেছেন কারমাইকেল কলেজের খ্যাতিমান অধ্যক্ষ ও সেকালের দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইলিয়াস আহমেদকে। তদানীন্তন সিএসপি বিভাগীয় কমিশনার একজন বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এবার ভাবুন আজকে সে ক্ষেত্রে আমরা কোথায় অবস্থান করছি। সেকালের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার শক্তি আমাদের অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য। আজকে স্বাধীন দেশে শিক্ষাঙ্গনের ওই অতীত গৌরবময় ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ হতে পারে। বাস্তবে তার সাক্ষাৎ পাওয়া ভার। আমি মনে করি, শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে শিক্ষাঙ্গনের ওই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে হবে বা সেখানে ফিরে যেতে হবে। আমরা শিক্ষকতা পেশায় অতীতের হারানো ঐতিহ্য তখনই ফিরে পাব, যখন আমাদের মেধাবী তরুণরা প্রশাসক, বিচারক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী পেশার মতো শিক্ষকতা পেশাতে আকর্ষণ অনুভব করবে এবং শিক্ষকতা পেশাকে সর্বোচ্চ মর্যাদার জায়গা মনে করতে পারবে।
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, নওগাঁ সরকারি কলেজ