সড়কে মর্মান্তিক মৃত্যু যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পরিবহন শ্রমিক কিংবা অন্য যে কোনো কেউ কখনও কখনও চালকের আসনে বসে হচ্ছে হন্তারক। বৃহস্পতিবার সমকাল ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা রাজধানীর নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের প্রাণহানির মর্মন্তুদ ঘটনাটি এরই সাক্ষ্যবহ। বুধবার কলেজের উদ্দেশে রওনা হওয়া নাঈমের মৃত্যু হয় গুলিস্তানে রাস্তা অতিক্রম করার সময়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচাপায়। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, গাড়িটি চালাচ্ছিল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী! পরদিনও আমরা এমন অঘটনের পুনরাবৃত্তি দেখেছি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির সামনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচাপায় প্রাণ হারান মোটরসাইকেল আরোহী কবির খান। পরপর দু'দিনের মর্মান্তিকতার মধ্য দিয়ে আবারও উঠে এলো সড়কে নৈরাজ্য কী ভয়াবহ রূপ নিয়েছে!

আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের পাল্লাপাল্লিতে বাসায় ফেরার সময় শহীদ বীরবিক্রম রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম রাজীবের গাড়িচাপায় মৃত্যুর মর্মন্তুদ ঘটনা। তখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফের শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। বুধবার গাড়িচাপায় মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া নাঈম হাসানও ছিলেন সেই আন্দোলনের অংশীজন।

আমরা জানি, বেপরোয়া চালকদের কারণে হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই স্ম্ফীত হছে। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই কিছুদিন আগেও প্রশ্ন রেখেছি- সড়ক কি মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে? এভাবে আর কত প্রাণ ঝরে যাবে? এই বর্বরতারইবা শেষ কোথায়? কে লাগাম টানবে বেপরোয়া চালকদের? যানবাহনের একজন হেলপার কিংবা অন্য কেউ কী করে চালকের আসনে বসে? এসব দেখভালের দায়-দায়িত্ব যাদের, তাদের নিরুত্তর থাকার অবকাশ নেই।

আমরা জানি, দিয়া ও রাজীবের প্রাণহানির পর তীব্র আন্দোলনের মুখে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার শাস্তি বাড়িয়ে সড়ক আইন জাতীয় সংসদে পাস করে। কিন্তু এর পরও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না চালকদের ট্রাফিক আইন না মানা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা কারণে। প্রায় প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে। সড়কপথ মানসম্পন্ন না হওয়া, জরাজীর্ণ যানবাহন, চালকদের অদক্ষতা- এমন কত কারণই না এজন্য দেখানো হয়। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির চাপায় যেভাবে শিক্ষার্থী নাঈম হাসান ও কবির খানের প্রাণহানি ঘটেছে, তা তো নিছক সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এ যে রীতিমতো হত্যাকাণ্ড। আমাদের অভিজ্ঞতা বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। আমরা দেখেছি, এর আইনি প্রতিকারের প্রতিবিধানও অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হচ্ছে না।

সড়কে দেখা যাচ্ছে, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্যের চিত্র। নাঈম হাসান ও কবির খানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত মৃত্যু এর বাইরে নয়। আমরা এও দেখেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রবল ক্ষমতাধর পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে এক পর্যায়ে সবকিছু থেমে যায়। থামে না কেবল মৃত্যুর মিছিল। থামে না নাঈম হাসানদের পরিবারের কান্না। এভাবে চলতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের যে কোনো পরিবহন তাদের নিয়োগকৃত চালক ছাড়া অন্য কেউ চালানোর সুযোগ পায় কী করে- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় তাদেরই। সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে জরুরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ। আমরা মনে করি, সড়কে যে মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটছে তা অমোচনযোগ্য অভিশাপ নয়, সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের দায়িত্বহীনতার নজির।

আমরা মনে করি, উপযুক্ত অবকাঠামোগত ব্যবস্থা, আইন মান্য করে চলতে বাধ্য করা, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা ও দায়িত্বশীল সবার নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ হওয়ার বিকল্প নেই। দিনের পর দিন সড়ক মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকতে পারে না। নাঈম হাসান ও কবির খানের এমন মৃত্যুর দায় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না।