প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার বিষয়টি নতুন নয়। কিন্তু এখন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের চিত্র যেভাবে স্ম্ফীত হয়ে উঠেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। 'বইপত্র ছেড়ে ওরা কোথায়'- শিরোনামে শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে প্রতীয়মান, করোনার অভিঘাত তা আরও প্রকট করে তুলেছে। ওই প্রতিবেদনে এও উঠে এসেছে, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। তা ছাড়া পরিবারে অভাব বৃদ্ধি, ছেলেদের বড় অংশ পরিবারের আয়ের প্রয়োজনে কাজে যুক্ত হওয়া ও করোনায় স্কুল বন্ধ থাকাও কারণ। সারাদেশে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুপস্থিত ছিল ৭৮ হাজার ৬২৮ জন।

আমরা জানি, এবার সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে কেবল তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তার পরও বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ও তাদের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটায় সহজেই প্রতীয়মান, করোনার অভিঘাত ঝরে পড়ার সমস্যা আরও বাড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ড, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অভিভাবকদের সচেতনতায় ঝরে পড়া অনেক কমে এসেছিল। এমনকি যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সচেতনতার কারণে বাল্যবিয়ের হারও হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু করোনা দুর্যোগ এ দুই ক্ষেত্রেই হতাশার ছায়া প্রলম্বিত করেছে।

এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখেছিলাম, করোনার প্রভাব যেমন অন্য খাতে পড়েছে, তেমনি এর কারণে শিক্ষা খাতেও বিপর্যয় অত্যাসন্ন। বস্তুত তা-ই দেখা গেল। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব এখন স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণগুলো সুস্পষ্ট। বাল্যবিয়ের অভিশাপ ফের দৃশ্যমান হওয়ার কারণও অস্পষ্ট নয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মতোই দুর্যোগে বাল্যবিয়ের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কার বিষয়েও এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা লিখেছিলাম।

আমরা জানি, বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক শিক্ষায় এর কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে। শিক্ষার স্তরে স্তরে সরকারের নানা সহযোগিতামূলক কর্মসূচি চলমান থাকলেও আমরা দেখেছি, করোনাকালে অনেক পরিবারই তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ফিসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই দিতে পারেনি করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। বাল্যবিয়ে শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেয়। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাল্যবিয়ে আরও বেড়েছে। আমরা উদ্বিগ্ন, বাল্যবিয়ে রোধে আইন থাকা সত্ত্বেও তা কোনোভাবেই থামছে না। অভিযোগ আছে, অসাধু জনপ্রতিনিধি ও কাজিদের যোগসাজশে ভুয়া খসড়া ফরমে রেজিস্ট্রি দেখিয়ে এসব বাল্যবিয়ে হচ্ছে।

আমরা মনে করি, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতাসহ সবার যূথবদ্ধ প্রয়াস এ অন্ধকার দূর করতে পারে। একই সঙ্গে জরুরি, যারা আইনবিরুদ্ধ কাজে নানাভাবে যুক্ত তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি আইন প্রয়োগে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবার কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ দরিদ্রবান্ধব সব কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোও দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনও জরুরি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর শিক্ষায় যে গতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তা নিম্নমুখী হোক, শুভবোধসম্পন্ন কারোরই এমনটি কাম্য হতে পারে না।

আমরা মনে করি, শিক্ষাক্ষেত্রে করোনা দুর্যোগউত্তর পরিস্থিতির নিরিখে সরকারের সহায়তামূলক কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো জরুরি। যে কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতেই হবে। আমাদের দেশের জন্য ঝরে পড়া এমনিতেই শিক্ষার অন্যতম সমস্যা।

মনে রাখা দরকার, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই ঝরে যায়। সব শিক্ষার্থীর যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গমন নিশ্চিত হয়, এ ব্যবস্থা নিতেই হবে। শিক্ষায় ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারের যৌক্তিক দাবির দিকে সমগুরুত্ব দিয়েই দৃষ্টি দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট সবার বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ঝরে পড়ার কারণগুলো যেহেতু চিহ্নিত, সেহেতু তা রোধ করা অমোচনযোগ্য অভিশাপ নয় বলে আমরা মনে করি।