রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে ফের জামিন জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রাপ্তবয়স্ককে শিশুর কাতারে ফেলে জামিন লাভের খবরটি আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে প্রতীয়মান, কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চলেছে জামিন নিয়ে। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক মোছা. কামরুন্নাহারের আদালতে খুনের মামলার প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে শিশু সাব্যস্ত করে জামিন দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটি ধাপেই আশ্রয় নেওয়া হয়েছে জালিয়াতির। সিটি করপোরেশনের জন্মনিবন্ধন সনদে স্থানীয় কাউন্সিলরের অসত্য জন্মতারিখের সুপারিশ, ওই সনদে দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সিল-সইয়ে অসংগতি ইত্যাদি অনিয়মের যেসব চিত্র উঠে এসেছে, তাতে এও প্রতীয়মান- বহু পক্ষের যোগসাজশেই এমন ঘটনা ঘটে চলেছে।

আমরা জানি, ভুয়া কাগজপত্রে জামিনের ঘটনা ইতোপূর্বেও ঘটেছে। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, এ রকম জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে অন্য কেউ এমন অপরাধের দুঃসাহস না দেখায়।

আমরা মনে করি, এমনটি নিশ্চিত না হওয়ায় অঘটন ঘটছেই। রোববার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনটি এরই সাক্ষ্য দেয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় একজন বিচারপ্রার্থীর পক্ষে আদালত পর্যন্ত যাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এর পর যদি ভুয়া কাগজপত্র কিংবা জালিয়াতি করে বিবাদী কিংবা আসামি জামিন বা খালাস পেয়ে যায়, তা তো আরও দুর্ভাগ্যজনক। জামিন পেতে নানা কারসাজির ঘটনা যদিও নতুন নয়, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ককে শিশুর কাতারে ফেলার যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলো এবং এর ফলে অনৈতিকতার যে ছায়া আরও বিস্তৃত হলো, তা উদ্বেগজনক।

অসাধু আইনজীবীদের 'ম্যানেজ' করে শুধু জামিনের ক্ষেত্রে জালিয়াতিই নয়, বছরের পর বছর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার অভিযোগও আছে বিস্তর। আমাদের স্মরণে আছে, কয়েক বছর আগে খোদ বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া জামিননামায় কারাগার থেকে আসামিকে মুক্ত করার চাঞ্চল্যকর খবরও মিলেছিল।

আমরা মনে করি, ওই তথ্য শুধু দুর্নীতি বা গুরুতর অপরাধের চিত্রই তুলে ধরেনি; আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতিও তা বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছিল জাল নথি, তথ্য গোপন ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ধর্ষণ, অস্ত্র, মাদক মামলাসহ হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের আসামিরাও জামিন নিয়ে পেরিয়ে এসেছে। শিপু হত্যার আসামি অনন্তর জামিনের ক্ষেত্রে যে তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা নিয়েও বরাবরের মতো প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক।

আমরা জানি, শিশু আসামি আদালতে মানবিক কারণেই সুবিধা পেয়ে থাকে। কিন্তু এই প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে আদালতে হাজির করার পর নিশ্চয়ই আদালত তার বয়স নির্ধারণ করেন। হত্যা মামলার মতো গুরুতর যে কোনো মামলার বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে সতর্কতার সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ জরুরি। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক আসামি অনন্তর ক্ষেত্রে এর সবকিছুরই যে ব্যত্যয় ঘটেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মনে করি, সংশ্নিষ্ট কোনো পক্ষেরই এ ঘটনার দায় এড়ানোর অবকাশ নেই। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্ত কার্যক্রম, অভিযোগপত্র গঠন ও উপস্থাপন, মামলার আলামত সুরক্ষার ধাপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এও জানি, বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী তো বটেই, রাষ্ট্রপক্ষের কোনো কোনো আইনজীবীর ভূমিকাও অসন্তোষজনক। তাদের কারণে মামলা দীর্ঘসূত্র হতে হতে এক পর্যায়ে সাক্ষ্য ও আলামত কার্যকর হয় না- এমন খবরও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

আমরা মনে করি, এ পর্যন্ত জামিন জালিয়াতির যত ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটি ঘটনার মূল হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে অনলাইন তথ্যভান্ডার গড়ে তোলাও বাস্তবতার নিরিখে জরুরি। পাশাপাশি জালিয়াত চক্রের মূলোৎপাটনে সময়ক্ষেপণ না করে কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে- এই প্রত্যাশাও রাখি। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এর কোনো বিকল্প নেই।