ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী দেশজ সংস্কৃতির লালন ও বিকাশে এদেশের মানুষের কাছে একটি জীবনবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম। এ শিল্পীগোষ্ঠী দেশীয় সংস্কৃতির লালন ও বিকাশে একটি লোকপ্রিয় নাম। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী এই গণসংগীত দলটি জন্মলগ্ন থেকেই ঐতিহ্য, সংগ্রাম আর সামাজিক দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। সংগ্রাম, বৈরী প্রকৃতি, দারিদ্র্য আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সজাগ উচ্চারণ ঋষিজ। ১৯৭৬ সালে এই লোকপ্রিয় দলটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রয়াত ফকির আলমগীর। তিনিই ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ঋষিজ আর ফকির আলমগীর যেন একই বৃন্তে দুটি ফুল। ঋষিজ ফকির আলমগীরের প্রাণের সংগঠন। ৪৫ বছর ধরে সংগীত সাধনায় এ সংগঠনকে ফকির আলমগীর মানুষের দ্বারে নিয়ে যান। বাংলাদেশে যত গণসংগীত দল আছে, ৩৮টি দল নিয়ে গঠিত হয় গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ। এই সমন্বয় পরিষদেরও সভাপতি ছিলেন ফকির আলমগীর।
ঋষিজের পথচলা যখন শুরু হয় তখন সারাবিশ্বেই আর্থসামাজিক আদর্শের দ্বন্দ্ব্বমুখর পরিবেশ ছিল। অবক্ষয়, অবিশ্বাস, ইতিহাস বিকৃতি, কুসংস্কারে গোটা সমাজ যখন দিশেহারা; অপসংস্কৃতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করে সুস্থ-সুন্দর কল্যাণমুখী সংস্কৃতিচর্চা শুরু করে। একই সঙ্গে এই ভূখণ্ডের ঐতিহ্যগত জাতীয় সংগ্রামের চর্চা অর্থাৎ বাঙালির লৌকিক সংস্কৃতির সঙ্গে চলমান জাতীয় সংগ্রামকে শিল্পিতভাবে উপস্থাপনার মাধ্যমে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী তার কাজ নিরসলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলা গণসংগীতের ক্রমাগত আধুনিকায়নের ধারাকে বজায় রেখে ঋষিজ প্রতিনিয়ত ভেঙে চলেছে অপসংস্কৃতির বাধার প্রাচীর।
শুরু থেকেই সংগঠনটি সামাজিক অঙ্গীকার পালনের পাশাপাশি কণ্ঠে ধারণ করেছে মানবমুক্তির গান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে গড়ে ওঠা এ সংগঠন জন্মলগ্ন থেকেই গণমানুষের গান পরিবেশনের মাধ্যমে আবহমান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরতে অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঋষিজ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় দুর্যোগ-দুর্বিপাকে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এ সংগঠন সবসময় সোচ্চার। ঋষিজ প্রগতির সপক্ষে দৃঢ় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গণশক্তির মহতী উদ্যোগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গেয়ে যাচ্ছে নবজীবনের গান। সব বৈপরীত্য ঠেলে ঋষিজ যখন পূর্ণ করছে তার পথচলার ৪৫টি বছর, সেই মুহূর্তে আমরা হারালাম আমাদের অভিভাবক, ঋষিজের প্রাণপুরুষ-প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফকির আলমগীরকে। অকুতোভয় নির্ভীক, লৌহকঠিন, স্বাধীনচেতা এ মানুষ গণসংগীতের নিবেদিত মুকুটহীন সম্রাট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন মানবতার কল্যাণে। সংগীতের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় গণসংগীতের পতাকা হাতে নিয়ে স্বাদেশিকতার মন্ত্র বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ হতে দেশান্তরে। কণ্ঠ আর কলম- দুটোই সমানভাবে তার কার্যক্রম বেগবান করে রেখেছিল। ফকির আলমগীরের মূলমন্ত্র ছিল সংস্কৃতির শক্তিতে গড়ে তোলা সম্প্রীতি। তার স্বপ্নই ছিল শিল্পের আলোয় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ হবে একটি মানবিক রাষ্ট্র। তাই গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে অশুভ অপশক্তিকে পরাজিত করে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ঋষিজ প্রাণপুরুষ ফকির আলমগীরের আদর্শ বুকে ধারণ করে তার আগামী দিনে পথ চলবে।
বিভিন্ন সময়ে ঋষিজের কর্মকাণ্ডকে যারা বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছিলেন তাদের মধ্যে বেগম সুফিয়া কামাল, ড. আহমদ শরীফ, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, ফয়েজ আহ্‌মদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, কলিম শরাফী, গাজীউল হক, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, কামাল লোহানী, শামসুজ্জামান খান, হাসান আজিজুল হক, আতিকুল হক চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল-মামুন, অজিত রায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাদের সংস্কৃতিমনস্কতার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ হয়েছি আমরা। ঋষিজের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আলী হাসু, দ্রোহী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, গণসংগীতশিল্পী মাহবুবুল হায়দার মোহনসহ স্মরণ করি উপমহাদেশের গণসংস্কৃতি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, ভূপেন হাজারিকা, অজিত পাণ্ডে কিংবা বিশ্বনন্দিত গণশিল্পী পল রবসন ও পিট সিগারকে। তাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য, সমর্থন আমাদের প্রেরণা ও সাহস জোগাবে।
ফকির আলমগীর অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাফল্যের সঙ্গে ঋষিজকে সংগঠিত করে পরিচালনা করেছেন সুচারুভাবে। তার সাংগঠনিক কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন এবং ঋষিজকে এক আত্মপ্রত্যয়ী সংগঠন হিসেবে জনগণের কাছে সমাদৃত করতে পেরেছেন। বর্তমানে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি ফকির আলমগীরের সহধর্মিণী সুরাইয়া আলমগীর ঋষিজের সব সদস্যের সম্মতিক্রমে সভাপতি হয়েছি। আগামী দিনগুলোতে তার কষ্টে গড়া ঋষিজকে এগিয়ে নিয়ে যাব তার আদর্শ বুকে ধারণ করে। আজ ঋষিজের ৪৫ বছরপূর্তি। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও আমরা গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করেছি। এবারের ঋষিজ পদকপ্রাপ্তরা হলেন- জাতিসত্তার কবি ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা, প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও শব্দসৈনিক শাহীন সামাদ এবং বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ। মানুষের ভালোবাসায় ফকির আলমগীরের রেখে যাওয়া কাজ সম্পাদনার মাধ্যমে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী এগিয়ে যাবে।
সভাপতি, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী এবং প্রয়াত ফকির আলমগীরের সহধর্মিণী