রাজনীতি সারা পৃথিবীতে সব দেশেই আছে। তবে আমাদের দেশের মতো তা সর্বজনীন খুব কম দেশেই আছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা রাজনীতি সচেতন, তবে সবাই রাজনীতি করেন না। তারা হয়তো বিশেষ কোনো দলের সমর্থকও, তবে কর্মী হয়ে সারাক্ষণ তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন না। ভোটের সময় নিজেদের পছন্দের দল বা প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে নাগরিক দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে সবাই রাজনীতি নিয়ে আলাপ করলেও সে অর্থে সচেতন নয়। অথচ জনসাধারণের রাজনীতি সচেতন হওয়া দরকার। তার মানে এই নয় যে, সবাইকে রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে হবে। 'সচেতন জনসমাজ' বলে যে কথাটি চালু রয়েছে, তার অংশ হিসেবে যে কেউ রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু আমরা দেখি সম্পূূর্ণ উল্টো চিত্র। এখানে সবাই রাজনীতিবিদ। যারা রাজনীতি বোঝেন তারাও যেমন; আর যারা বোঝেন না, তারাও। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখন আর রাজনৈতিক দলের কর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই নেতা। ল্যাম্পপোস্ট বা গাছের ডালে যেসব ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলতে দেখা যায়, সেগুলোতে ওয়ার্ড কমিটির সদস্যকেও নেতা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। অথচ বড় বড় রাজনীতিক কখনও নিজেদের নেতা বলে দাবি করেন না। তারা নিজেদের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অনেকেই মন্তব্য করে থাকেন, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো রাজনীতিতেও যে অবক্ষয়ের ধারা সৃষ্টি হয়েছে, তারই ফল ভোগ করছি আমরা।
রাজনীতি এক সময় আমাদের দেশে বিজ্ঞ, জনদরদি ও সমাজসেবকদের কর্মকাণ্ড হিসেবেই গণ্য হতো। সে সময় রাজনীতির মানুষদের সবাই সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত। রাজনীতিকরাও পরস্পর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতারা মঞ্চের বক্তৃতায় একে অপরকে তুলাধুনা করলেও মঞ্চের বাইরে তাদের মধ্যে ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। একজন অসুস্থ হলে আরেকজন ছুটে যেতেন তাকে দেখতে। রাজনৈতিক আক্রমণ করতে গিয়ে তারা শালীনতার সীমা অতিক্রম করতেন না কখনোই। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রতিহিংসা। এখন আর রাজনীতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার পথে কেউ যেতে চায় না। বরং পেশিশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে একে অপরকে মাঠ থেকে বিতাড়িত করতে তারা যেন বদ্ধপরিকর। এই মনোভাব আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানি বৃদ্ধি করে চলেছে। এসব নিয়ে আজ পর্যন্ত বহু কথা বলা হয়েছে। পরিবেশের উন্নতির জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে সচেতন মহলের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে কাজটি যারা করবেন, সেই রাজনীতিকরা খুব একটা কর্ণপাত করছেন, এমনটি মনে হয়নি কখনও। ফলে গণমানুষের কাছে দেশ ও জনসেবার ব্রত হিসেবে পরিচিত চিরায়ত সে রাজনীতি আজ অনেকটাই অচেনা হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির বর্তমান চেহারা-সুরত দেখে আমরা তাকে চিনতে পারছি না। এই না চেনার কথাটিই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে একজন অসহায় পিতার কণ্ঠে, যার সন্তান সম্প্রতি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। ঘটনাটি সবারই এখন জানা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মাহাদী জে আকিব গত ৩০ অক্টোবর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। হামলাকারীরা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে তার মাথার খুলি গুঁড়ো করে দেয়। উদ্ধার করে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলেও অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। মাথার খুলি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, তা খুলে চিকিৎসকরা তার পেটের চামড়ার নিচে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছেন। যথাসময়ে তা পুনঃস্থাপন করা হবে। হাসপাতালের বিছানায় শায়িত মাহাদীর যে ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তাতে দেখা গেছে, মাথায় ব্যান্ডেজের ওপর লিখে রাখা হয়েছে- 'হাড় নাই, চাপ দেবেন না'। ১ নভেম্বর সমকাল খবরের শিরোনাম করেছিল সে বাক্যটিকেই। ছবিটি দেখে এবং ওই বীভৎস খবর পড়ে প্রতিটি মানুষ চমকে উঠেছিল। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার মাহাদী জীবন ফিরে পাবেন- এ আশা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমত এবং চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তার জীবন রক্ষা পেয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন। ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার পর আকিবের পিতা স্কুলশিক্ষক গোলাম ফারুক মজুমদার সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, 'চমেকে এ কেমন রাজনীতি, যেখানে সহপাঠীদের হাতে একজন ছাত্রকে এভাবে রক্তাক্ত হতে হয়? (সমকাল ২০ নভেম্বর, ২০২১)।
আকিবের বাবার মুখে দেশের কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মানুষের মনের কথাটিই যেন উচ্চারিত হয়েছে। এ দেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন; রাজনীতিকে ভালোও বাসে। তবে সে রাজনীতি হতে হবে শান্তিপূর্ণ, অহিংস। কিন্তু সে রাজনীতি আজ ক্রমেই সোনার হরিণে পরিণত হচ্ছে। একদা যে রাজনীতি আমাদের মনে প্রত্যাশার আলো জ্বালাত; অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস জোগাত; সে রাজনীতি এখন গোধূলির আলোর মতোই অপস্রিয়মাণ। আমাদের প্রত্যাশার সূর্য যেন ক্রমশ হতাশার দিগন্তে অস্তমিত হতে চলেছে।
নভেম্বর মাসেই ঘটেছে আরেকটি বেদনাদায়ক ঘটনা। ১৭ নভেম্বর ছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ওই দিন টাঙ্গাইলের সন্তোষে গিয়েছিল তার মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে। সেখানে মরহুম নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন নবগঠিত রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া ও সদস্য সচিব সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। পত্রিকার খবর অনুযায়ী পুলিশ সেখানে উপস্থিত থাকলেও ছাত্রলীগের হামলাকারী কর্মীদের ঠেকানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। কেন করেনি, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। এখানে বড় প্রশ্ন হলো, একটি রাজনৈতিক দল দেশের একজন অভিভাবকতুল্য রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে শাসক দলের কর্মীদের রোষানলে পড়বে কেন? খাতা-কলমে অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক। এখানে যে কারও যে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন, সদস্যপদ গ্রহণের আইনগত অধিকার রয়েছে। তাহলে ড. রেজা এবং নুরের অপরাধটা কোথায়? সবচেয়ে বড় কথা হলো, যার মাজার প্রাঙ্গণে ওই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ছাত্রলীগ কর্মীরা ঘটিয়েছে. তিনি কে- তা কি ওরা জানে? ওরা কি জানে- যে রাজনৈতিক দলটিকে ওরা অভিভাবক সংগঠন বলে মনে করে, সেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মওলানা ভাসানী? ওরা কি জানে- যে বঙ্গবন্ধুর নামে ওরা অহর্নিশ স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর করে; তিনি মওলানা ভাসানীকে পিতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন?
অনেকেই আফসোস করে বলে থাকেন, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সহনশীলতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে অশ্রদ্ধা, অসম্মান, অসহিষুষ্ণতা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা। আগে মঞ্চের বক্তৃতায় একে অপরকে কাবু করে রাজনৈতিক মাঠ দখলে নেওয়ার পরিশীলিত প্রতিযোগিতা চলত। এখন দৈহিক জোরে মাঠ দখলের এক ভয়ংকর প্রবণতা রাজনীতিকে গ্রাস করছে। এর ফলেই আমাদের চিরচেনা জনসেবা দেশসেবার সে রাজনীতি ক্রমেই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। এই সর্বনাশা প্রবণতার অবসান কীভাবে হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা- তা এক বিরাট প্রশ্ন।
সাংবাদিক ও রাজনীতিক বিশ্নেষক