সম্প্রতি বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ২৪ নভেম্বর সমকালের এক প্রতিবেদনে রাজধানীতে তিন মাসে সাত কিশোর-তরুণ খুন হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজা করে বন্ধুকে বিকৃত নামে ডাকা, হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, রিকশাওয়ালাকে মারধরে বাধা দেওয়া ছিল ভিকটিমদের 'অপরাধ'। চাঞ্চল্যকর এসব খুনের ঘটনা বর্তমান সময়ের অপরাধ এবং বিভিন্ন ধরনের বিচ্যুতিমূলক আচরণেরই প্রতিচ্ছবি। কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটছে কিশোর-তরুণদের মধ্যে। আবার পারিবারিক কলহের বলিও হতে হচ্ছে অনেককে এবং কিছু ক্ষেত্রে শিশুদেরও ভিকটিম হতে দেখছি। এসব হত্যাকাণ্ড নির্দিষ্ট কোনো বয়সী, জনগোষ্ঠী কিংবা শ্রেণি-পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূলে আছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। আমরা দেখছি, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সহিংসতা ক্রমেই প্রকট রূপ নিচ্ছে। তৃতীয় ধাপের এ ইউপি নির্বাচনে হতাহতের যে মর্মান্তিক চিত্র দেখা গেল, তাও অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
সামাজিক পরিবর্তন, সমাজের উত্তরণ, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে সম্পত্তি, জমিজমার মূল্য গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর ফলে পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ সব জায়গায় সম্পত্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব আগের তুলনায় প্রকট। এসব দ্বন্দ্বের কারণে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুঁজিবাদের বিষাক্ত ছোবল একদিকে আমাদের লোভী করে তুলছে, অন্যদিকে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ফলে সামাজিক অসমতা দৃশ্যমান কয়েক গুণ, যা পরোক্ষভাবে কিশোরদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে।
কিশোরদের মধ্যে যারা অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারভুক্ত, তারা নানা কারণে সমাজের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। অর্থনৈতিক চাপ তাদের পরিবারগুলোকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। ফলে তারা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে, পারিবারিক স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় রয়েছে। নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য যে ধরনের কল্যাণমূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। আর এই সংগ্রাম করতে গিয়ে তারা ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা কিংবা সামাজিকীকরণের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে এসব কিশোর পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে বিচ্যুতিমূলক আচরণের মধ্যে যুক্ত হয়। তাদের মানসিকতায় যেহেতু অস্থিরতা বিরাজ করে, ফলে তারা যে কোনো ধরনের ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে দেখে এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
২২ নভেম্বর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সোহেলকে নগরের পাথরিয়াপাড়ার কার্যালয়ে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গুলিতে সোহেলের সহযোগী হরিপদও নিহত হন। আমরা বারবারই বলে আসছি, আধুনিকায়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের ফলে নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির অপব্যবহারে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সমাজে অনেক ধরনের পশ্চিমা মূল্যবোধের অনুপ্রবেশ ঘটছে। এ ক্ষেত্রে মাদকের প্রসঙ্গ সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমা জীবনযাত্রা অনুকরণ করতে গিয়ে সমাজে মাদকসেবীদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত- কেউই বাদ যাচ্ছে না। এর ফলে উচ্চবিত্তের অনেক সন্তান অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করছে। মাদক সেবনের পর সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছে কিংবা বিয়েবহির্ভূত একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এতে হত্যাকাণ্ড ও অপমৃত্যু- উভয় ধরনের ঘটনাই বাড়ছে। যেমনটি আমরা এর আগে রাজধানীর কলাবাগানের ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছি। তবে, বরগুনায় যে ঘটনা ঘটেছিল, তা কিন্তু উচ্চবিত্তের বিষয় নয়। সেখানে গ্যাং কালচার আমরা দেখেছি। এখন দেখছি, মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা শূন্য সহিষুষ্ণতা নীতি গ্রহণ করেও মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ভবিষ্যতে যদি মাদককে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে সর্বক্ষেত্রে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করতে হবে।


আধুনিক সমাজব্যবস্থায় আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই অনৈতিক কিংবা বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সহিংসতা বাড়ছে; পরিবারগুলোয় অশান্তি বিরাজ করছে। অনেক সময় এই অনৈতিক সম্পর্কের বলি হচ্ছে শিশুরাও। আমরা একদিকে তথাকথিত আধুনিক রীতিনীতি গ্রহণ করছি, অন্যদিকে সনাতনী চিন্তাধারাও আঁকড়ে আছি। আমাদের সমাজের বড় অংশ বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক সমর্থন করে না। ফলে এসব ঘটনা যখন জানাজানি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন তা থামাতে প্রত্যক্ষদর্শীর ওপর হামলে পড়ে সম্পর্কে জড়ানো নারী-পুরুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ঘটনার সাক্ষী হয় ছোট শিশুরা। গত এক দশকে আমরা বেশকিছু শিশুকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখেছি তার আপন বাবা কিংবা আপন মায়ের দ্বারা। কয়েক দিন আগে তেমনই একটি ভয়ংকর ঘটনার তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এক ব্যক্তি তার বান্ধবীকে নিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে তা দেখে ফেলে তারই সন্তান। শিশুটি যখন সে ঘটনা তার মাকে বলে দেওয়ার চিন্তা করেছে, তখনই বাবা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সামাজিক অস্থিরতা ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের বলি হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুসহ কোনো বয়সের মানুষ।
করোনাকালে দীর্ঘ সময় আমাদের কেটেছে বন্ধ্যত্বের মধ্যে। মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থেকেছে অথবা তাকে সাইবার জগতে বুঁদ হয়ে থাকতে হয়েছে। এর ফলে ডমেস্টিক ভায়ালেন্স, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি নানাবিধ চাপে অনেককে আত্মহননের পথও বেছে নিতে দেখা গেছে। পৃথিবীর কোনো সমাজই এ ধরনের অপরাধকর্ম থেকে রেহাই পায়নি। প্রতিটি সমাজ তার যুগ সন্ধিক্ষণে ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, মাদকের বিস্তার কিংবা গ্যাং কালচারের মতো বিচ্যুতিমূলক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে দায়ী করে আমরা পার পেতে পারি না। এসব অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসর থেকে আমরা যদি এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিণাম বরণ করতে হবে। রাষ্ট্রের বিধিবিধান, আইন ও বিচারিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার কায়েম করা গেলে অনেকেই এসব অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়তে অনুৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে জনকল্যাণকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রের নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজ, এনজিওগুলোরও অনেক কিছু করার আছে। সরকারের সঙ্গে এই পক্ষগুলো একত্রে কাজ করলে এ ধরনের বিচ্যুতিমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করা সম্ভব হবে।
সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়