চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে সংঘাত-সহিংসতায় হতাহতের মর্মান্তিক ঘটনার পর তৃতীয় ধাপে তা আরও প্রকট হয়ে ওঠার আলামতই লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বস্তুত অনাকাঙ্ক্ষিত সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো আমাদের। সোমবার সমকালে 'সহিংস ভোটে ৯ মৃত্যু' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার যে চিত্র ফের উঠে এসেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিজিবির একজন সদস্যসহ নয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহতের সংখ্যা দেড়শর ওপরে। নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরেও হামলা হয়েছে। আমরা দেখেছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরের এই নির্বাচনে সহিংসতায় প্রথম ধাপে পাঁচজন, দ্বিতীয় ধাপে সাতজন, তৃতীয় ধাপে নয়জনসহ এই তিন ধাপে ভোটের আগে-পরে প্রাণহানির সংখ্যা ষাটের ওপরে। আহতের তালিকা আরও দীর্ঘ। নির্বাচন কমিশনের সচিব তৃতীয় ধাপের এ নির্বাচনকে 'সহিংসতাবিহীন নির্বাচনের মডেল' হিসেবে দাবি করেছেন। আমরা তার এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, নির্বাচনকেন্দ্রিক চলমান সংঘাত-সহিংসতার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। যে কোনো মূল্যে এই রক্তপাত বন্ধে তাদের করণীয় সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচনের মূল নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা তা করতে পারেননি। উপরন্তু তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন, বাস্তবতাবর্জিত বক্তব্য নির্বাচন ঘিরে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রবল নাগরিক অসন্তোষেরই শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। আমরা জানি, আরও কয়েকটি ধাপে এ নির্বাচন হবে। আমরা বারবার নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছি। এখনও আমরা দেখছি, স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য রাখছেন। ২৪ নভেম্বর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় তিনি বলেছেন- 'মারামারি হবে না- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি না'। এর আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, 'সংঘাতের দায় প্রশাসন, পুলিশ কিংবা নির্বাচন কমিশনকে দিলে চলবে না। ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় পাহারা দিয়ে নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব নয়।' আমরা মনে করি, এমন দায়িত্বহীন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি তাদের দায়িত্ব পালনে এখতিয়ারের ব্যর্থতা প্রকাশের পাশাপাশি তার শপথও ভঙ্গ করেছেন। আমরা জানি, সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন। কিন্তু নির্বাচনকালীন সব কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ প্রশাসনিক স্তরগুলোর দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক এখতিয়ারবলে নির্দেশ প্রতিপালনে ফের যে মর্মন্তুদ চিত্র দেখা গেল, তা শুধু নির্বাচন ব্যবস্থাই নয়, গণতন্ত্রের জন্যও অশনিসংকেত। চলমান এ নির্বাচনে অনিয়ম-অস্বচ্ছতার পাশাপাশি নৈরাজ্যের দায়ও বর্তায় নির্বাচন কমিশনের ওপর। আমরা জানি, স্থানীয় সরকার কাঠামোয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নিলেও তাদের অনুসারী কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা কোণঠাসা। মূলত সংঘাত-সহিংসতা হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যে। এই 'গৃহদাহ' এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী দলের কোনো কোনো নীতিনির্ধারকও 'বিব্রত'। কীভাবে নির্বাপিত হবে দলের 'গৃহদাহ'; কীভাবে বন্ধ হবে নিজেদের মধ্যে হানাহানি-রক্তারক্তি- এ সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দায় দলেরই। কোনো কোনো বলবান প্রার্থী ভোটারদের যেভাবে হুমকি-ধমকি, হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা সার্বিক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই- এও আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলেছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এরও দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনকেন্দ্রিক হানাহানি-রক্তারক্তির দায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, দল ও অংশীজনদেরও এড়ানোর অবকাশ নেই। আমরা মনে করি, ভোটাধিকার খর্বসহ সহিসংতায় ম্লান গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচনের ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে হবে নির্বাচন কমিশনকেই। নির্বাচন কমিশনের দায় ভুলে যাওয়ার কোনোই অবকাশ নেই।