শিশুদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি, নন্দনের এনেছে সংবাদ।' শিশু-বয়স জীবনের এক বিশেষ অবস্থা। মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, শিশুর প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ তার পরবর্তী জীবনকে বহুল পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং শিশুকে উপযুক্ত ও সুস্থ পরিবেশের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। শিশুর জীবনে যেমন স্নেহ দরকার, তেমনি দরকার শাসনের। আর পরিবারের স্নেহের আবরণেই শিশু তার নিজের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ পায়।
শিশুর মনোবিকাশ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই চলে আসে পরিবারের কথা। পরিবারই সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিশুর সঠিক মনোবিকাশ ঘটাতে পারে। মূলত পরিবারে যদি একটি শিশুর যথাযথ সামাজিকীকরণ হয়, তবে ভবিষ্যতে ওই শিশুটির সামাজিকভাবে বিচ্যুত আচরণের আশঙ্কা অনেক কমে যায় বলে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
সামাজিকীকরণ বলতে মূলত এক ধরনের শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এটি একটি জীবনভর প্রক্রিয়া হলেও এর যাত্রা শুরু হয় শিশু যে পরিবারে বেড়ে ওঠে সেই পরিবার থেকে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশু পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যাশিত সব আচরণ ও মূল্যবোধ আয়ত্ত করে। পরিবার থেকে শিশু সমাজের বিভিন্ন প্রথা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, জ্ঞান, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে এবং নিজেকে সেই অনুযায়ী বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। পারস্পরিক মিথস্ট্ক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্য যেমন বাবা-মা, ভাইবোন ও অন্যরা শিশুকে সমাজে বসবাসের জন্য সব কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত আচরণগুলো শিক্ষা দিয়ে থাকে। সুতরাং পরিবার হলো শিশুর মনোবিকাশের সূতিকাগার।
দার্শনিক জন লক মনে করেন, জন্মলগ্নে শিশুর মন একটি সাদা কাগজের মতো থাকে। এই সাদা কাগজে পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিভিন্ন ছাপ পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা মোকাবিলা করার জন্য পরিবারই শিশুকে প্রস্তুত করে দেয়। শৈশবে শিশুর চিন্তাধারা থাকে আত্মকেন্দ্রিক। তাই পরিবারের সদস্যরা যদি শিশুর সঙ্গে মিথস্ট্ক্রিয়ায় উদার ও শিশুবান্ধব আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে না পারে, তবে শিশুর পক্ষে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। মূলত শিশুর সঙ্গে পরিবারের যেসব ব্যক্তি ও বস্তুর নৈকট্য থাকে, তার ভিত্তিতেই সে নিজেকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এই হিসেবে পরিবারে 'মা' ঠিক যতখানি শিশুর মনে প্রভাব ফেলে, অন্য সদস্যরাও ততখানি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর মনোবিকাশে কৌতূহল প্রবৃত্তি ও অনুকরণ প্রবৃত্তির উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। পাশাপাশি শিশুর কল্পনাবিলাসকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব প্রবৃত্তিই শিশুকে বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করে।
পরিবারের দায়িত্ব হলো শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে সঠিক সামাজিকীকরণের মাধ্যমে এ প্রবৃত্তিগুলোর যথাযথ বিকাশ ঘটানো। এই প্রবৃত্তির বশেই শিশু নানা ধরনের মনগড়া খেলা আবিস্কার করে এবং পরিবারের সদস্যদের অনুকরণ করে তাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে খেলাগুলো সম্পাদন করে। স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে শিশু যদি এ খেলায় অংশগ্রহণের জন্য পরিবারে অনুকূল পরিবেশ পায় তবে তার মনে আনন্দের উদ্রেক হয়। এ আনন্দই শিশুর সঠিক মানসিক বৃদ্ধি ও বিকাশের চাবিকাঠি। সমাজে বসবাসের জন্য একজন মানুষের চিন্তা, আদর্শ, নৈতিকতা ও সচেতনতার ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারেই। তাই শিশুর জীবনে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধ, অভিভাবকের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিনয় প্রকাশ এবং পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করার যে সংস্কৃতি চালু আছে, তা পরিবার থেকেই শিশু সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিখে থাকে। পরিবারের মধ্যেই শিশু অপরের সম্পদ, অধিকার ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে শেখে এবং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। স্কুলের বাইরে পরিবারই হলো নৈতিকতা শিক্ষার প্রধান উৎস।
শিশুর মনোবিকাশে নিরাপত্তাবোধের জন্ম দিতে পারে পরিবার। পরিবারের সদস্যরা শিশুকে অধিক সময় দিয়ে শিশুর ইচ্ছা ও ভাবনা সহজে জেনে নিতে পারেন এবং সে অনুযায়ী তার সঙ্গে মিথস্ট্ক্রিয়ায় যেতে পারেন, যা শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ ও সন্তোষজনক মানসিক অগ্রগতির সহায়ক।
সহকারী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান), মানবিক বিভাগ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়