আমরা বিজয় দিবসের পঞ্চাশ বছরের দ্বারপ্রান্তে। রণাঙ্গনের যোদ্ধা হিসেবে মানসপটে ভেসে উঠছে একাত্তর পর্বের অনেক অধ্যায়। পঞ্চাশ বছরে রক্তস্নাত বাংলাদেশ নানা দিকে অনেক এগিয়েছে। অর্জনের খতিয়ানও কম দীর্ঘ নয়। একাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ও নেতৃত্বে আমরা যে অঙ্গীকারে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম মুক্তির লক্ষ্যে, সে ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হইনি। রক্তগঙ্গা পেরিয়ে আমরা অর্জন করেছিলাম এই বাংলাদেশ। বিজয়ের মাসে সেই মহান পর্বের ভেসে ওঠা স্মৃতি প্রশ্ন রাখছে- আমাদের অঙ্গীকারের বাংলাদেশ থেকে আমরা কত দূর। এই প্রশ্ন সামনে রেখেই সেই দিনগুলো ফিরে দেখার প্রয়াস।
আখাউড়া যুদ্ধের যুদ্ধপরিকল্পনার নথি, অপারেশন ম্যাপ, যুদ্ধ শুরুর সংকেত এবং কোডসহ সবকিছুই আমি স্বহস্তে ২৭ নভেম্বর ১৯৭১ রাতে ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড সেন্টার থেকে গ্রহণ করি। এটা করি আমার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার (তৎকালীন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী) এবং ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সফিউল্লাহর নির্দেশে। আমার মতো কনিষ্ঠ অফিসারের কাছে এমন একটি দলিল প্রদান এবং এ কাজে আমার ওপর ব্যাটালিয়ন ও ব্রিগেডের আস্থা স্থাপন ছিল একাধারে ভাগ্য ও শ্নাঘার বিষয়। এর সঙ্গে একটি দায়িত্ব জড়িয়েছিল, ছিল জীবনের চূড়ান্ত ঝুঁকি। এটা সেই ধরনের ঝুঁকি ছিল, যে ঝুঁকি নিয়ে আমার ভাই শহীদ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গানে। তবে এমন দায়িত্ব ও ঝুঁকি নিতে আমি দলের অ্যাডজুটেন্ট পদটি ছেড়ে কোম্পানি অফিসারের পদটি নিয়েছিলাম। সরাসরি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়ে মৃত্যুকে মাথায় পেতে নেওয়ার জন্য ওই ঝুঁকি নিয়েছিলাম। সেই কারণে 'অপারেশন নাট ক্র্যাক' সফল করতে দ্বিতীয় বেঙ্গলের ভ্যানগার্ড কোম্পানিকে (আলফা) শত্রু বূ্যহের ছয় মাইল গভীরে নেওয়ার দায়িত্বটি আমার ওপর বর্তায়। মনে পড়ে, ভারতীয় ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মিশ্র সিলগালা করা কাগজগুলো আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, 'Hope, you would be the lucky chap to enter Dhaka first.' তখন দূরে নিশ্চুপ বসেছিলেন জেনারেল গনজালভেস।
আমার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী একই কথা বলেছিলেন ২৮ নভেম্বর রাতে। জানা গেল আমাদের অপারেশনের নাম 'অপারেশন নাট ক্র্যাক'। অপারেশন কোড ওয়ার্ডটি আমাকে জানিয়ে দেওয়া হলো। ওই কোড ওয়ার্ডটি মুজিব ব্যাটারিসহ ভারতীয় আর্টিলারি ও ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশনের জন্য ফায়ারিং তথা আর্টিলারি আক্রমণের সংকেত ছিল। ওই গোপন কোড ওয়ার্ডটিকে মহামূল্যবান সংকেত হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করে ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের আলফা কোম্পানি নিয়ে আখাউড়া সীমান্তে হাজির হই। কথা ছিল পরিকল্পনামতো আমি প্রথমে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করার পর, অন্যরা আমাকে অনুসরণ করবে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। আমরা আখাউড়া সীমান্তে জড়ো হয়েছি। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড ফায়ারিং শুরু হলো, বেশিরভাগই 'এয়ার বার্স্ট' শেল। ছিটকে পড়লাম একটা গর্তের মধ্যে। আমাদের বেশ কয়েকজন আহত হলো। মুহূর্তের জন্য বিমূঢ় হলেও অন্য সেনাসদস্যদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। তার পরও নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য ওই রাতে ভেতরে ঢুকলাম না।
৩০ নভেম্বর ১৯৭১, এক শীতের রাতে আখাউড়া যুদ্ধে আমার রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানির অগ্রবর্তী দলটি নিয়ে কয়েক মাইল বিস্তীর্ণ মাইন ফিল্ডের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা বূ্যহের মধ্যে ঢুকতে হয়েছিল। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় আমাদের দেখা যাচ্ছিল। তাই প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হই। চষা ক্ষেতের আইলের মধ্যে মাইন খুঁজে এগোবার সময় ছিল না। সমস্ত হৃদয় ছিল ভয়ংকর উত্তেজনা ও কিছুটা বিষাদে পূর্ণ। কেননা, এর আগের দিন সন্ধ্যায় আক্রমণ শুরুর আগেই আমাদের ওয়্যারলেস অপারেটরসহ ১১ জন সৈন্য আহত হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আকস্মিক গোলাবর্ষণে। আক্রমণের সময় বা এইচ-আওয়ার ছিল ১ ডিসেম্বর রাত ১টায়। এর বেশ আগে আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হলাম। অবস্থান গ্রহণ করলাম শত্রু বূ্যহের ৪০০-৫০০ মিটারের মধ্যে- দ্রুত হাতে খুঁড়ে নেওয়া হলো ফক্সহোল। একটু পরেই পৌঁছালেন আমার কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান (প্রয়াত জেনারেল অব.)।
রাত ১টা বাজতেই আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো পাকিস্তানি সেনাদের বাঙ্কার ও রক্ষণ বূ্যহগুলো গোলার আঘাতে চুরমার করার জন্য ওয়্যারলেসে সংকেত পাঠালাম ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী ও আমাদের মুজিব ব্যাটারিকে। চরম উত্তেজনার মধ্যে 'ধামাকা' সংকেতটি উচ্চারণের পরপরই শুরু হলো প্রচ গোলাবর্ষণ। এর সঙ্গেই শুরু হলো পূর্বাঞ্চলে পরিচালিত শক্তিশালী যুদ্ধ 'অপারেশন নাট ক্র্যাক'। বিরামহীন ভারী গোলাবর্ষণের শব্দে আজমপুর রেলস্টেশন এবং আশপাশের জনপদগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ওই সময় কিছু গোলা আখাউড়া রেলস্টেশনেও আঘাত করেছিল। মিত্রবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল শত্রু বূ্যহগুলো চুরমার করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রি-ইনফোর্সমেন্টের সাহস ও শক্তিটুকু নিঃশেষ করে দেওয়া। আমার প্রতি নির্দেশ ছিল পুনরায় 'ধামাকা' শব্দটি উচ্চারণের পরই গোলাবর্ষণ বন্ধ হবে। আমি অনেকটা ইচ্ছা করেই প্রায় তিন ঘণ্টা পর বন্ধুদের পুনরায় সংকেত পাঠালাম 'ধামাকা ...'। ততক্ষণে শত্রুবাহিনীর অনেকগুলো বাঙ্কারই চুরমার হয়ে গেছে।
গোলাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পরপরই হালকা মেশিনগান, গ্রেনেড ও রকেট লঞ্চার নিয়ে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর রক্ষণ বূ্যহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। শুরু হলো রকেট লঞ্চার দিয়ে কংক্রিট বাঙ্কার ধ্বংস এবং বাঙ্কারে বাঙ্কারে 'ক্লোজ কমব্যাট'। ওই যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তীব্রতা জেনারেল ভন রোমেলের অ্যাটাক গ্রন্থ তথা বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ নিকট যুদ্ধের কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিল। ওই সময় চার্লি কোম্পানির কমান্ডার লে. ইব্রাহিম (পরবর্তীতে জেনারেল) আমার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেন আজমপুরের উত্তরে প্রায় শুকনো একটি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত পুরোনো জেটি এলাকায়। এদিকে আজমপুর রেলস্টেশনের কাছে অবস্থান নেয় ব্রাভো কোম্পানি। ওই কোম্পানি ৪ ডিসেম্বের পর্যন্ত কমান্ড করেন লে. বদি। ভোর ৫টার দিকে আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থানে নিজেদের সুসংগঠিত করে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপরে আঘাত হানতে শুরু করলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, তাদের বেশকিছু কংক্রিট বাঙ্কার অক্ষতই রয়ে গেছে। ঘন কুয়াশার মধ্যে সেখান থেকে তারা আমাদের দিকে গোলাগুলি বর্ষণ করে চলেছে। এক সময় আজমপুর রেলস্টেশন থেকে কিছু পাকিস্তানি সেনা পূর্ব দিকে নেমে এসে আমাদের ওপর প্রচ পাল্টা আঘাত শুরু করল।
সকাল হয়ে আসছিল। কিন্তু চারদিকে এত বেশি ঘন কুয়াশা ছড়িয়ে ছিল যে, দু-তিন ফুট দূরের বস্তুও দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। আমাদের অনেকেই তখন খোলা স্থানে। অন্যদিকে, পাকিস্তানিদের অনেকে তাদের বাঙ্কার ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা বূ্যহের আড়ালে। এক সময় তাদের সুতীব্র আক্রমণের মুখে কুয়াশার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে আমার কোম্পানি কমান্ডার (আলফা কোম্পানি) অধিকাংশ প্লাটুন নিয়ে আমার দু'পাশ থেকে পিছু হটে গেলেন। ইচ্ছাকৃত বা অন্য কোনো ত্রুটির জন্য নয়, নেহাতই ভুল বোঝাবুঝির জন্য। আমি মাত্র তিন-চারজন সৈন্য নিয়ে একটি গাছের আড়াল থেকে পাকিস্তানিদের প্রতিহত করে যাচ্ছিলাম। এমন সময় সুবেদার সুলতান আমার পেছন থেকে এসে এই বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলার খবর দিল। আমি তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম এবং পিছু হটতে অসম্মতি জানালাম। শেষ পর্যন্ত এক রকম জোর করেই সুবেদার সুলতান আমাকে পেছনে টেনে নিয়ে গেল। এ অবস্থায় লে. ইব্রাহিমও পেছনে হটে গেলেন। এই উইথড্রলের পর ১ তারিখ সকাল ৮টা-৯টার দিকে বিমর্ষ ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান ও অন্যদের দেখলাম কর্নেল সফিউল্লাহ (পরবর্তীতে জেনারেল) ও মেজর মঈনের কাছে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন। এরপর আমরা নিজেদের সংগঠিত করে পুনরায় নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে গেলাম এবং বিকেল ৩টার মধ্যেই শত্রুদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হলাম।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আমি ক্যাপ্টেন (বর্তমানে অব. জেনারেল) মতিনকে দেখলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। অসম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি কেবল পূর্বদিকে ধেয়ে আসা পাকিস্তানিদের প্রতিহতই করেননি, উপরন্তু পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে আজমপুর স্টেশনের লাগোয়া উত্তরে অবস্থান নিলেন। তার সঙ্গে ছিল তিন নম্বর সেক্টরের মুজাহিদ মিশ্রিত দুই কোম্পানি সেনা। অগ্রসরমান পাকিস্তানি সেনাদের ওপর প্রচ আক্রমণ চালিয়ে আমরা সন্ধ্যার মধ্যেই আজমপুর স্টেশনের উত্তর দিকটা মুক্ত করে ফেললাম। ব্রাভো কোম্পানি কমান্ডার লে. বদিউজ্জামানও তার অবস্থান থেকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল। বিকেলের পর আমাদের সম্মিলিত আক্রমণে আজমপুর রেলস্টেশনের দক্ষিণ দিকের কিছু অংশও শত্রুমুক্ত হয়ে গেল। তবে ওই এলাকায় অসংখ্য মাইন পোঁতা থাকায় এবং পাকিস্তানিদের কয়েকটি কংক্রিট বাঙ্কার অক্ষত থাকায় আমরা এগোতে পারছিলাম না। ২ তারিখ ভোর থেকে আবার আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচ আক্রমণের সম্মুখীন হলাম। আকস্মিক আক্রমণে আজমপুর স্টেশনের দখলকৃত স্থানটুকুও তাদের হাতে চলে গেল। রেলস্টেশনের দক্ষিণে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারগুলোতে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল এবং আমাদের প্রাথমিক আক্রমণের পরও তাদের কেউ কেউ সেখানে লুকিয়ে ছিল। যার ফলে ২ তারিখ রাতে প্রচ যুদ্ধের পরও আমরা ওই এলাকা কবজা করতে পারলাম না। এর মধ্যে বিরামহীনভাবে চলছিল পাকিস্তানি আর্টিলারির গোলাবর্ষণ এবং দিনের বেলায় বিমান হামলা। ৩ ও ৪ তারিখে যুদ্ধ ভয়ংকর আকার ধারণ করে। পাকিস্তানি কামান ও বিমান হামলা ভারতীয় আর্টিলারির সহায়তাকে অনেকটা গৌণ করে তোলে। তবুও এর মধ্যে আমরা এক ইঞ্চিও পিছু হটিনি। বৃষ্টির মতো গোলাগুলি উপেক্ষা করে আমাদের সেনারা অসম্ভব মরিয়া হয়ে পাকিস্তানি বাঙ্কারগুলোর মধ্যে ঢুকে আক্রমণ চালায়। কোনো কোনো স্থানে যুদ্ধটা হাতাহাতি পর্যায়েও হয়েছিল। এতে ৪ ডিসেম্বর বেশকিছু অসম সাহসী যোদ্ধা বিজয় ছিনিয়ে আনতে শাহাদাতবরণ করেন। ওই দিন শহীদ হলেন ব্রাভো কোম্পানি কমান্ডার লে. বদিউজ্জামান।
এ সময়েই বেলোনিয়া অপারেশন থেকে ফিরে লে. সেলিম যোগ দিল ব্রাভো কোম্পানিতে। অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়লেন তিনি। এই স্থানের যুদ্ধটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ভয়ংকরতম যুদ্ধগুলোর মতোই একটি। এতে পাঁচ দিন ছয় রাত অবিরাম যুদ্ধের পর ব্রিগেডিয়ার সাদুউল্লাহর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে গেল। বীরত্বের শ্রেষ্ঠ ছবি হতে পারত এসব ঘটনাকে উপজীব্য করে। এটা সত্য যে, এ যুদ্ধে বীরত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। যে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ভারতের সীমানা অতিক্রম করেনি এবং যুদ্ধে বাঁশপাতার মতো কেঁপেছে সেই হয়েছে বীরবিক্রম। অন্যরা যথাযথভাবে নলখাগড়া বলে বিবেচিত হয়েছে। তার পরও মুক্ত দেশ ও বিজয়ের চেয়ে মূল্যবান আর কী হতে পারে! এরপর সরাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ৯ তারিখে আশুগঞ্জের কাছে একটি ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন হলাম। আমাদের ডানে ১০ বিহার রেজিমেন্ট জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়ছে, আর এই ফাঁকে আমরা ডিঙি নিয়ে মেঘনা অতিক্রম করে ভৈরবে পৌঁছালাম। ভৈরবে আবার দলছুট পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষ। সেখানে আমাদের বাহিনীর একটি অংশ পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করে তদের যখন ব্যস্ত ও পদানত করছে, তখন আমরা খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধ ভেঙে মুরাপাড়ায় পৌঁছালাম। ডেমরা পৌঁছালাম ১৩ ডিসেম্বর। ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় বেঙ্গলের আলফা কোম্পানির এক প্লাটুন সেনা নিয়ে আমি নিজে আক্রমণ চালাই বাড্ডা ও গুলশানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। তখন কাউলুন রেস্তোরাঁর কর্মী আনিস ও আরও দু'জন আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করেছিল। এটি উল্লিখিত হয়েছে জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরীর আত্মকথায়। ১৫ তারিখ রাতে আবার একই স্থানে আক্রমণ চালিয়ে আরও ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলাম। জেনারেল (তৎকালীন মেজর) মঈন অনিচ্ছা সত্যেও আমাকে পেছনে ফিরিয়ে নিলেন। শেষ রাতে নিজের বাঙ্কারে খড়ের মাঝে গা এলিয়ে স্বপ্ন দেখলাম বিজয়ী বেশে দেশে ফিরছি। সত্যি সত্যি ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে হেঁটে মার্চ করে ঢাকায় প্রবেশ করলাম। যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলাম, তখন রাত। তবু উড়িয়ে দিলাম বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। ১৭ ডিসেম্বর সকালে ওই পতাকা নিয়ে আরেক যুদ্ধ স্টেডিয়ামে। ওপর থেকে চার পাকিস্তানি আক্রমণ করে বসল আমাদের। তাদের অসম সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করলেন শহীদ লে. সেলিম এবং শহীদ সুবেদার মোমেন। ওই পতাকার জন্য প্রাণ দিলেন শহীদ ইকবালসহ অনেকগুলো কিশোর, ইস্কাটনে এবং বাংলামটরে।
ওই দিনই দুপুরে পুরো রেজিমেন্ট নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছালাম। জিমখানা ক্লাবটিকে আমাদের অফিস ও আবাসস্থল বানিয়ে নিলাম। ক্লাবের দুই ধারে উঁচু করে উড়িয়ে দিলাম বাংলাদেশের লাল- সবুজ পতাকা। শীতের হাওয়ার মাঝে নীল আকাশের পটভূমে রক্তাক্ত পতাকা উড়ছে। আর পেছনে পড়ে রইল- ২৫ মার্চ ৭১-এর রাতে 'সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর', সাতরাস্তার মোড়, সার্ভে অব ইস্ট পাকিস্তান ও পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গমস্থলে ৩৭ জন পুলিশ নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে আমাদের দুই ভাইয়ের যুদ্ধ শুরুর সেই দিনটি। মনে পড়ে যায় ২৭ মার্চ ৭১-এ অগ্নিদগ্ধ ঢাকায় পোড়া গৃহ, বৃক্ষ ও মানুষের গন্ধের মাঝে ড. জিসি দেব, আমার শহীদ খালু মোহাম্মদ আলীকে খোঁজাসহ ৭০ জন নিহত ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে জগন্নাথ হলের মাঠে তাদের মরদেহ আবিস্কার (প্রত্যয়ন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব পশ্চিম এবং অধ্যাপক রতনলাল চক্রবর্তী জগন্নাথ হল হত্যাকাণ্ড)। ওই সময় দৃশ্যমান হয়- অগ্রসরমান পাকিস্তানি বুলডোজারের মুখে নতুন করে 'এল-টাইপ' গর্ত ফুঁড়ে জেগে থাকা শহীদদের হস্তপদ। সেদিন ঢাকা মেডিকেলের ৭নং ওয়ার্ডে বিক্ষত ড. গুহঠাকুরতা ও জগন্নাথ হলের জনৈক পরিমলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার ঘটনাটি জেগে আছে মনে। জেগে আছে আর্কিটেক্ট বিল্ডিংয়ের সামনে রেইনট্রি গাছের ছায়াতলে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে খণ্ডকালীন বন্দি হওয়ার বিষয়টি।
এরপর মা-বাবাকে কাঁদিয়ে তাদের প্রেরণাতেই ৩১ মার্চ যুদ্ধময়দানমুখী অভিযাত্রা এবং সরাইলের সিও আমার খালুর উপস্থিতিতে ক্যাপ্টেন মতিনের অধীনে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে আমাদের দুই ভাইয়ের যোগদান। ৬-৭ এপ্রিল আশুগঞ্জ নদীতীরে ক্যাপ্টেন গাফ্‌ফারের সঙ্গী হয়ে অপর পাড়ে কামানের গোলা নিক্ষেপে সহায়তা করে অবশেষে ১৪ এপ্রিল ক্যাপ্টেন মতিনকে নিয়ে লালপুর যুদ্ধে যোগদান। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠে আসে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সারা দিনমান পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়ে সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে শাহবাজপুরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধে যোগদান। ব্রিজের পর ব্রিজ উড়িয়ে শহীদ ক্যাপ্টেন রানা ও শহীদ ক্যাপ্টেন মালহোত্রার মতো সাহসী ভারতীয় অফিসারদের হারিয়ে পেছনমুখী হলাম এবং তেলিয়াপাড়া প্রতিরক্ষায় যোগদান করলাম। সেখানেই ৪ এপ্রিল কর্নেল ওসমানী, কর্নেল রব এবং ক'জন হবু সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছকটি আমরা এঁকেছিলাম। পরে সিলেট সড়কে মাইলস্টোন ৮৪ ও ৮৬-তে পাকিস্তানের ২৫ বালুচকে পরাভূত করে তাদের ছিন্নভিন্ন দেহের সঙ্গে জামিলাসহ তিন বন্দি নারীর রক্তাক্ত রুমাল, স্মারক খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি ভুলিনি। অবশ নিম্নাঙ্গ ও শরীরের কষ্ট আজও মনে করিয়ে দেয় একটি কঠিন নিকট যুদ্ধের পর ৬০-৭০ ফুট উঁচু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মেরুদণ্ডের ১১নং হাড় ও বাঁ পা ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়টি। ওই তেলিয়াপাড়াতেই মে'র ৭১-এর শুরুতে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর আজাদ কাশ্মীর রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে আমার ও সুবেদার ইসমাইলের নিঃসঙ্গ যুদ্ধের পর সুবেদার ইসমাইলের শহীদ হওয়ার বিষয়টি আজও মনে জ্বলজ্বল করছে। কমলপুর যুদ্ধের অগ্রনায়ক শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন, তেলিয়াপাড়ার দুলা মিঞা ও লে. সেলিমকে নিয়ে ইসমাইল হতে পারত বীরশ্রেষ্ঠ।
প্রকৃত বীর কখনও নিরস্ত্রের বিরুদ্ধে বা নারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না; নৈতিকতাবিরোধী কর্মেও সম্পৃক্ত হয় না। সে জেনে-বুঝে দেশমাতৃকা উদ্ধারের জন্য, যুদ্ধের মোড় ঘুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধ করে। হঠাৎ গুলি-গোলায় বা শহীদ এ সম্মানের যোগ্য নয়; শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ার জন্য। করুণাসিক্ত হওয়াটা যথেষ্ট নয় কোনোভাবে। সারা বিশ্বে যুদ্ধবীরের সম্মানের পরিমাপক ও সূচক এগুলোই। এই সেলিম বারবার ওই তেলিয়াপাড়ার ঘাঁটিটিকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। ওর পাঁচ সাথী শহীদ হয় তেলিয়াপাড়া প্রতিরক্ষা যুদ্ধে। আহত হয় লে. ফজলে হোসেন। সেখানেই সেলিম পাকিস্ততানি বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল হাতাহাতি যুদ্ধে; যে যুদ্ধের স্মারক আজও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে- ওই যুদ্ধের ধার ও ধারা সে নিয়ে গিয়েছিল নভেম্বরের শুরুতে বেলোনিয়া পর্যন্ত। ৩০ নভেম্বর, ১৯৭১-এ ওই যুদ্ধ শেষে সেলিম মাকে লিখেছিল-
৩০/১১/৭১
মা,
পহেলা নভেম্বর নোয়াখালীতে যাবার হুকুম হলো। ফেনীর বেলোনিয়া ও পরশুরাম মুক্ত করার জন্য। ৬ই নভেম্বর রাতে চুপচুপ করে শত্রু এলাকার অনন্তপুরে ঢুকলাম। পরদিন সকালে ওরা দেখল ওদেরকে আমরা ঘিরে ফেলেছি। ৮ই নভেম্বর রাতে ঐ জায়গা সম্পূর্ণ মুক্ত হলো। শত্রুরা ভয়ে আরো কিছু ঘাঁটি ফেলে পালিয়ে গেল। পরদিন চিতোলিয়া আমরা বিনাযুদ্ধে দখলমুক্ত করলাম। আস্তে আস্তে আরো এগিয়ে গেলাম। ২৭ শে নভেম্বর যখন আমরা ঐ এলাকা থেকে ফিরে এলাম তখন আমরা ফেনী মহকুমা শহর থেকে দেড় মাইল দূরে ছিলাম, পাঠান নগর ছিল আমাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি। শীঘ্রই মাগো আবার তোমার সাথে দেখা করতে পারব ভেবে মনটা আনন্দে ভরে গেলজান মা, এই যুদ্ধে আমরা ৬০ জন শত্রু ধরেছি। আমাদের কোম্পানীর ৩ জন শহীদ ও একজনের পা মাইনে উড়ে গেছে। দোয়া করো মা।
সেলিম

এক মুহূর্তের জন্য মনের আয়না থেকে সেলিম মুছেনি তার মাকে। সে অবশেষে নিজেই মুছে গেল মিরপুর মুক্ত করতে গিয়ে। তার মৃত্যুর পরপর ঈদের দিন তার অভুক্ত বাবা ইজিচেয়ারে হেলে পড়ে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে কেবলই কেঁদেছে, 'কামরুল! কামরুল!' (সেলিমের ডাকনাম) বলে। সে কান্না আমৃত্যু থামেনি। সেলিমের মাকে বঙ্গবন্ধু সান্ত্বতনা দিয়ে সেলিমকে অমর করে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি ৭৩-এর পত্রপত্রিকার পাতায় ভেসে উঠেও মুছে যায়। আমরণ সেলিমের মা কেঁদে গেছেন সব বীরের মাঝে টিকে থাকা শ্রেষ্ঠ বীর সেলিমের জন্য, সেলিমের প্রাপ্য সম্মানের জন্য। ভিক্ষে নয়, শ্রেষ্ঠ বীরের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য। সেলিম তার ডায়েরির প্রথম পাতায় লিখে ছিল- এটি বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দিও। আর লিখেছিল- উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। এই আপ্তবাক্য নিতান্তই কথামালা হয়ে থাকবে শতবর্ষ পরে। আমরা কি পেরেছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে? ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পে আজও এ দেশ আক্রান্ত হয়। এমনটি তো কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক-বাহকদের।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক। চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ