রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের 'এত্তা জঞ্জাল' নিয়ে মঙ্গলবার সমকালে যে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, সে সংকটের সমাধান সহজ নয়। আমরা জানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নাগরিক অসন্তোষ নতুন নয়। যথাযথভাবে বর্জ্য সংগ্রহ না করা, অসময়ে বর্জ্য পরিবহন কিংবা যাত্রাপথে কঠিন, তরল ও বায়বীয় বর্জ্য ছড়ানো নিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রায়শ সমালোচনা দেখতে পাওয়া যায়। তবে এসব নিছক কারিগরি প্রশ্ন। বাস্তবে এ ব্যবস্থা ভেতর থেকে কীভাবে ঘুণে ধরেছে, তা জনপরিসরে স্পষ্ট হলো সম্প্রতি। আরও দুর্ভাগ্যজনক, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই হতাশাজনক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে দুটি মূল্যবান প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে। আমরা দেখেছি, গত ২৪ নভেম্বর গুলিস্তান এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসির একটি বর্জ্যবাহী গাড়ির চাপায় মারা যান নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। পরে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্জব্যাহী গাড়িটি চালাচ্ছিল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এ নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যেই পরদিন কারওয়ান বাজার এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসির আরেকটি গাড়িচাপায় পিষ্ট হন সংবাদকর্মী আহসান কবির খান। নাগরিক ভাগ্যের নির্মম পরিহাসই বলতে হবে- এদিনও গাড়িটি চালাচ্ছিল একজন 'বহিরাগত' চালক। মঙ্গলবার সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী গাড়িতে এই 'চর্চা' দীর্ঘদিনের। চালকের সহকারী ছাড়াও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মশক নিধনকর্মীরাও এসব গাড়ির 'চালক'। সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির ভাষ্য, ডিএসসিসির অধীন ৩৩৭টি ভারী যানবাহনের বিপরীতে চালক মাত্র ৮৬ জন। অপরদিকে ডিএনসিসির যান্ত্রিক বিভাগের অধীন বর্জ্যবাহী ১৩৭টি ভারী যানবাহনের বিপরীতে উপযুক্ত চালক মাত্র ৪১ জন। স্বাভাবিকভাবেই হালকা যানবাহন চালনার সনদধারী চালকদের হাতে ভারী যানবাহনের স্টিয়ারিং তুলে দিতে হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটাকে 'সফট' অনিয়ম বলা যেতে পারে। কিন্তু তার বদলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা মশক নিধনকর্মীদের চালকের আসনে বসিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক, 'ভাড়াটে' যেসব কর্মীকে 'দায়িত্ব' দেওয়া হয়েছে, তাদের ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। আরও উদ্বেগের বিষয়, সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালনার জন্য 'ভাড়াটে' কর্মী নিয়োগের নেপথ্যে কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, রয়েছে বড় ধরনের দুর্নীতি। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, এসব চালকের 'বেতন-ভাতা' আসে সিটি করপোরেশন থেকে বরাদ্দ তেল কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে আসলে দু'ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রথমত, নিয়োগপ্রাপ্ত চালকরা স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করছেন না। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশনের অর্থে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষবৃক্ষে জল ঢালা হচ্ছে। অস্বীকার করা যাবে না- এমন অনিয়ম আরও নানা স্তরে রয়েছে। কিন্তু সেই অনিয়ম বন্ধ করতে গিয়ে রাজধানীতে বর্জ্যের স্তূপ জমা করা হবে কেন? সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল বিক্ষোভের মুখে প্রথম দুই দিন অনির্ধারিত চালকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াতেই এমন বিপত্তি। ফলে 'পরিস্থিতি স্বাভাবিক' রাখতে আবারও হালকা যানবাহন চালকদের হাতে ভারী যানবাহনগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এর মধ্য দিয়ে আসলে অনিয়মকেই প্রশ্রয় দেওয়া হলো। স্বীকার করতে হবে, দিনে দিনে যে জঞ্জাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় জমেছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দিয়ে নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা সুদূর পরাহত। অনিয়মই অব্যবস্থাপনার জনক। আমরা মনে করি, এজন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। এ জন্য প্রয়োজনে 'আউটসোর্সিং' করে চালানো যেতে পারে। একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত চালক নিয়োগ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ভাবতে হবে চালকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কথা। কারণ বর্তমান বেতন কাঠামোতে অনেকে সিটি করপোরেশনের চালক পদে কাজ করতে আগ্রহী হন না। যারা হন, তারা অন্য উপায়ে যে 'পুষিয়ে' নিতে চান, তার প্রমাণ ইতোমধ্যে মিলেছে। তবে সবকিছুর আগে দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপারে দেখাতে হবে শূন্য সহিষুষ্ণতা। নিয়ম ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এর বিকল্প নেই।

বিষয় : রাজধানীর বর্জ্য

মন্তব্য করুন