মাতৃভূমি ও তার স্বাধীনতা প্রাণের চেয়ে প্রিয়। একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা অকাতরে প্রাণ দিয়ে এ কথাটির সত্যতা আবার প্রমাণ করেছেন। প্রতিটি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল নিজের জীবনের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলে ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনবাতিটি নিভে যাওয়ার আগ মূহূর্তে প্রত্যেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সঙ্গী জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি চিৎকার করে বলেছেন, 'আমি শত্রুর গুলির আঘাতে মরে যাচ্ছি, কিন্তু তোরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবি, আমার কথা ভাবিস না। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে গিয়ে ছেলেমেয়েদের বলবি, তাদের ভবিষ্যতের জন্য আমরা আমাদের বর্তমান দিয়ে গেলাম।' পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপারেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগ মূহূর্তে আমরা গ্রুপের সকলে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একবার জাতীয় সঙ্গীতটি গেয়ে নিতাম। 'মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি'- এ লাইনটি গাইতে গাইতে সকলের চোখ থেকে ঝরঝর করে নেমে আসা পানিতে বুক ভেসে যেত। তাতে আমরা দুর্বল হতাম না। বরং প্রচণ্ড মানসিক শক্তি পেতাম। তারপর জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে যাত্রা শুরু হতো।
এখন এসব কথা মনে হলে কেমন যেন আনমনা হয়ে যাই। সেদিনের এই আশা-আকাঙ্ক্ষা শুধু মুক্তিযোদ্ধা নয় সমগ্র বাঙালি জাতিকে প্রচণ্ড শক্তিতে জাগ্রত করেছিল বলেই মাত্র নয় মাসের মাথায় প্রতাপশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আস্তে আস্তে কোথায় যেন সব হারিয়ে যেতে থাকে। ৫০ বছরের মাথায় এসে আজ সত্তর-একাত্তরের অনেক কিছুই খুঁজে পাই না। খুঁজতে গিয়ে যা কিছু পাই তার বিপরীতে হারানোর বেদনায় জর্জরিত মন বারবার বলতে থাকে, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। যে 'জয় বাংলা' ধ্বনি প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অফুরন্ত শক্তি ছিল, সেটি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে খণ্ডিত, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। বেদনাবিধুর মনে তাই কয়েকদিন আগে সহযোগী একটি দৈনিকের একটা কলামের মাধ্যমে দাবি জানিয়েছি, 'জয় বাংলা'কে জাতীয় ধ্বনি করা হোক। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে লেখাটি। কিন্তু সে দাবি পূরণ হবে, তা আশা করতে পারছি না। তরুণ প্রজন্মের মধ্য থেকে দাবি উঠেছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের সংগ্রাম ও একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জনে সোনালি ফসল বাহাত্তরের সংবিধানে পরিপূর্ণভাবে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আজকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, এ দাবিও সহসা পূরণ হবে না।
জয় বাংলা ধ্বনি এবং বাহাত্তরের সংবিধান কোনো একটি দলের বিষয় নয়, এটা জাতীয় ইস্যু, রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কেন বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া যাবে না, জয় বাংলা ধ্বনিকে কেন জাতীয় ধ্বনি করা যাবে না। এ প্রশ্নের সঠিক উত্তরের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক কোথায় সেটি পাওয়া যাবে এবং বোঝা যাবে কেন সেই ফারাক এখনও বিদ্যমান। সবচেয়ে বড় ফারাকের কথাটি একটু বলে নিতে চাই। দীর্ঘ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর ও প্রধান মৌলিক লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ হবে একটি পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা, নারী-পুরুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, রাষ্ট্র কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। অনন্য এক সম্প্রীতির উদাহরণ হবে বাংলাদেশ। এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের রক্ত এক হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে মিশে গেছে, কারও মনের মধ্যে সামান্যতম প্রশ্ন সেদিন ওঠেনি। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কেন আজ চরম সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা দেখতে হয়।
আসলে সবই ঠিক ছিল, স্বাধীনতার পর বাহাত্তরে বঙ্গবন্ধু সঠিক পথেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সব তছনছ হয়ে গেল। ভাবতে গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাই না। মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশ দ্বারা অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সকল অঙ্গ থেকে কেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, দর্শন ও চেতনা বলতে যা বোঝায়, তার সবকিছু বাতিল করে দিলেন। জিয়াউর রহমানের আমলে যা দেখেছি, সেটি একজন মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা হতে পারে তা কিছুতেই ভাবা যায় না। মনে হয়েছে পাকিস্তানের কোনো সেনা শাসক ক্ষমতায়। জিয়াউর রহমানের আমলে ছোট-বড় ১৯টি সামরিক অভ্যুত্থানের নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। প্রতিটি অভ্যুত্থানের ঘটনায় শুধু মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানদের ফাঁসি হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে এবং লাইন ধরে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।



একাত্তরে যারা জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন, মাত্র ৪-৫ বছরের মাথায় তারা দেশদ্রোহী হয়ে গেলেন। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বললেন, এদের বিশ্বাস করা যায় না। কেউ পেটের দায়ে, কেউ জীবনের মায়ায় নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা লুকিয়ে রাখতে পারলেই বোধ হয় বাঁচা যাবে, এমন অবস্থাই হয়ে যায় পঁচাত্তরের পর। এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য আর কী হতে পারে। হ্যাঁ, গত ১২-১৩ বছর মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত মাথা উঁচু করে চলতে পারছে, এটা ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মর্যাদার স্বীকৃতি ৫০ বছরের মাথায়ও মিলল না। তারপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব যার ওপর নির্ভরশীল, সেই ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক আদর্শ শুধু নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে তাই নয়, রীতিমতো হুমকির মধ্যে আছে। বিগত দুর্গাপূজার সময় যা ঘটেছে, তা বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। চরম উগ্রবাদ সাম্প্রদায়িক হেফাজতের সঙ্গে সরকার আপসরফা করার পরেও তারা প্রকাশ্যে হুমকি দেয়, 'বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য' বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হবে। যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এত ত্যাগ, এত বিজর্সন সেই দেশে স্বাধীনতার শত্রু ধর্মান্ধতার এমন বিপজ্জনক উত্থান ঘটবে, তা একাত্তরের বিজয়ের পর ঘুনাক্ষরেও আমাদের মনে আসেনি, ভাবতে পারিনি। কিন্তু পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসক কর্তৃক একাত্তরের পরাজিত পক্ষ জামায়াত ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিণতিতে যে সর্বনাশ হয়েছে, তা যেন ক্রমশই মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে গ্রাস করতে চাইছে।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াতের দু'জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হওয়াতে সেই সর্বনাশের পথ আরও উন্মুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ এক অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। সশস্ত্র জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে ঘোষণা দেয়, 'আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান'। কী সর্বনাশের কথা। মুক্তিযোদ্ধারা পথেঘাটে লাঞ্ছিত হতে থাকে। এক জামায়াত মন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, 'এদেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, একাত্তরের গণ্ডগোল ছিল ভারতের ষড়যন্ত্র।' মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এর চেয়ে চরম অপমান আর কী হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লালনকারী সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তির ওপর জঙ্গি সংগঠনগুলো একের পর এক আক্রমণ এবং হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। দেশ ছাড়তে যাতে বাধ্য হয় তার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলে সুপরিল্পিত আক্রমণ। জ্বালাও-পোড়াও এবং নির্যাতন। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ শঙ্কিত হয়। বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া হাউস থেকে সতর্ক করা হয় এই মর্মে যে, পরবর্তী আফগানিস্তান হতে চলেছে বাংলাদেশ। পুলিশের সামনে জঙ্গিরা আদালত প্রাঙ্গণে আক্রমণ চালায়। বিচারকদের গ্রেনেড মেরে হত্যা করা হয়। জঙ্গিরা ঘোষণা দেয়- তারা তাগুদি, অর্থাৎ মানুষের তৈরি আইন মানবে না। হলি আর্টিসানের মতো জঙ্গিবাদী আক্রমণ বাংলাদেশে ঘটেছে। এর সবকিছুর মূলে রয়েছে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য আজ সবচেয়ে বড় হুমকি। অথচ এই অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই একাত্তরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।
আমাদের জীবদ্দশায় এই অপশক্তির কবল থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারবে, তা আজ আর প্রত্যাশা করতে পারছি না। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক এটি। তবে হ্যাঁ, পঞ্চাশ বছরের মাথায় এসে প্রত্যাশা পূরণের পথে অগ্রগতি অবশ্যই আছে। পঁচাত্তরের পরে ভাবতে পারিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কিন্তু আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে। প্রত্যাশা পূরণের জায়গায় এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের উন্নয়নে অগ্রগতির মাত্রা অবশ্যই প্রত্যাশা পূরণের পথে আশার হাতছানি দেয়। ভালো লাগছে এই ভেবে যে, স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় এসে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সব সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে। নতুন প্রজন্ম সকল প্রকার বিভ্রান্তি কাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দর্শনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে, এটা বড় এক আশার কথা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা- নতুন প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় এমন একটা বাংলাদেশ আবার আমরা দেখে যেতে চাই।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, মুক্তিযোদ্ধা; গবেষক ও লেখক