চলমান আন্দোলনের মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরের জন্য 'হাফ পাস' বা অর্ধেক ভাড়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। বস্তুত যেভাবে অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি প্রশাসন কিংবা বাস মালিকরা সমাধান করতে চাইছেন, এভাবে সমাধানের আশা দুরূহ। কেবল অর্ধেক ভাড়াই নয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতেও আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। হতাশাজনক হলেও সত্য, সমাধানে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

বুধবার সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশ, অর্ধেক ভাড়া কিংবা নিরাপদ সড়ক কোনো ক্ষেত্রেই সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরাই বরং সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন কিন্তু তাতে কোনো আশ্বাসও তারা পাননি। এমনকি তিন বছর আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনটিও বাস্তবায়ন হয়নি, উল্টো পরিবহন নেতাদের দাবি মেনে সরকার আইনটি শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। হাফ পাসের বিষয়টিও এভাবে পরিবহন নেতাদের ইচ্ছামতো ঠিক করা সমীচীন নয়।

আমরা মনে করি, শর্তযুক্ত অর্ধেক ভাড়ার সিদ্ধান্ত যথার্থ হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে সারাদেশে হাফ পাস কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ আর্থিক দিক বিবেচনা করলে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীরাই বেশি নাজুক। শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার জন্য বাসের পাশাপাশি, লঞ্চ এবং ট্রেনেও হাফ পাস দাবি করেছেন। আমরা মনে করি, দূরপাল্লার যানবাহন না হলেও মহানগর ও জেলা পর্যায়ে অর্ধেক ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া উচিত।

আমরা দেখছি, এ আন্দোলনের মধ্যেই দু'জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। কিছুদিন আগে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান এবং সোমবার এসএসসি পরীক্ষার্থী মাইনুদ্দিনের নিহত হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেবল রাজধানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং সারাদেশেই তা ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা যে ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন, তার কোনোটিই অস্বীকারের উপায় নেই। তারা সড়কে মৃত্যুর মামলার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত করার কথা যেমন বলছেন, তেমনি হতাহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণেরও দাবি তুলেছেন। চলাচলের জন্য ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ সর্বত্র নেই; পরিকল্পিত বাস 'স্টপেজ' ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও নেই। চালকদের প্রশিক্ষণ ও গাড়ির ফিটনেসের অভাবও প্রকট। তাছাড়া ট্রাফিক নিয়ম পাঠ্যসূচিতে ঠিকভাবে থাকলে এ ব্যাপারে জনসচেতনতাও বাড়ত। নিরাপদ সড়কের স্বার্থেই এসব দাবি মানা জরুরি। বস্তুত এগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই আইন আছে কিংবা সরকারের নির্দেশনা আছে, তারপরও সেসব বাস্তবায়ন না হওয়াটা দুঃখজনক। জেল-জরিমানা বাড়িয়ে করা সড়ক পরিবহন আইন, নানা কমিটির সুপারিশমালা, টাস্কফোর্স গঠন- এ রকম কিছু উদ্যোগ এর আগে সরকার নিলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলো বাস্তবায়নে জোর নেই কেন? এখানেই সরকারের তৎপরতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের রাজপথ থেকে ফেরাতে সরকার ও বাসমালিকরা আহ্বান জানালেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ৯ দফা দাবি নিয়ে আলোচনায় বসতে এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকেও ডাক পাননি শিক্ষার্থীরা। দুই সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা মন্তব্য করলেও তারা কেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন না? সড়কে যেভাবে প্রাণ ঝরছে, যেভাবে সড়কে বিশৃঙ্খলা চলছে, তাতে নিরাপদ সড়কের জন্য সরকারেরই বরং এগিয়ে আসা উচিত। এটি অজানা নয় যে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশ। এ ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিলেও কেন তা ভেস্তে যাচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় হিসেবে সরকার গ্রহণ করতে পারে। আমরা আগেও বলেছি, শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের অধিকারের বিষয়েও সরকারকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। বাসমালিকরা তাদের স্বার্থ দেখবেন কিন্তু শিক্ষার্থী ও দেশের স্বার্থের নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। আমরা চাই, প্রশাসনের তরফ থেকে দ্রুত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা যেমন করতে হবে একই সঙ্গে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হোক।