করোনায় দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে তিন মাস হতে চলেছে। এ সময়ের মধ্যে করোনার ধকল সামলে শিক্ষা কার্যক্রম কতটা সচল হলো, শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম কেমন হচ্ছে, কত শিক্ষার্থী এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসেনি- এসব প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক কোনো চিত্র সংবাদমাধ্যমে আসেনি। যদিও গত ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে এবং পরে প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, করোনায় ঝরে পড়াদের তালিকা করা হবে। সেই তালিকার সবশেষ অবস্থা কী, তাও আমরা জানি না।

শিক্ষা প্রশাসন না জানালেও কত শিক্ষার্থী এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসেনি, অর্থাৎ ঝরে পড়েছে তাদের হিসাব নানাভাবে আসছে। বেসরকারি গবেষণা তো বটেই এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার সুবাদে দাপ্তরিক হিসাবও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। ২৬ নভেম্বর সমকালে প্রকাশিত 'বইপত্র ছেড়ে ওরা কোথায়' শিরোনামের প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় আটাত্তর হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। ১৪ থেকে ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া ওই পরীক্ষা শুরুর আগেই ফরম পূরণের হিসাবে দেখা গেছে, ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এর সঙ্গে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর হিসাব ধরলে মাধ্যমিক পর্যায়ে যে একটি বড় অংশ ঝরে গেছে, তা স্পষ্ট। একইভাবে ২ ডিসেম্বর শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায়ও ফরম পূরণের হিসাবে ইতোমধ্যে ১১ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। প্রথম দিনের পরীক্ষায় সাড়ে ১৫ হাজার অনুপস্থিত ছিল। পরীক্ষাটি শেষ হওয়ার পর আমরা এখানেও পূর্ণাঙ্গ ঝরে পড়ার হিসাবটিও নিশ্চয়ই দেখব।

এসএসসি-এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষা হওয়ার কারণে এখানে ঝরে পড়ার হার সহজেই বের করা গেছে। কিন্তু করোনার পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অন্যান্য শ্রেণি থেকে কত শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে তার হিসাব স্পষ্ট নয়। অথচ হিসাবটি থাকা জরুরি। শিক্ষামন্ত্রী গত ৩০ অক্টোবর জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ৯০ ভাগের বেশি শিক্ষার্থীর অ্যাসাইনমেন্ট জমা পড়েছে উলেল্গখ করে বলেছেন- 'তার মানে তারা ঝরে পড়েনি। এখনও অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে ভয়ে আছেন। যার ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার শতভাগ নয়।' কথা হলো, ৯০ ভাগের বেশি শিক্ষার্থীর অ্যাসাইনমেন্ট কি সত্যিই জমা পড়েছে? সে হিসাবও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ জানায়নি। ৯০ ভাগ জমা পড়লেও সেটা নিশ্চয়ই আশাজাগানিয়া। কিন্তু তার ওপর ভিত্তি করেই বা কীভাবে বলা যায়, তেমন ঝরে পড়েনি?

তেমন ঝরে না পড়াটাই বরং স্বস্তিদায়ক। তবে তার পরিসংখ্যান দরকার। যদি ১০ ভাগ শিক্ষার্থীও ঝরে পড়ে থাকে তাও শিক্ষা প্রশাসন বলুক। এটি খোলাসা না করার সমস্যা দুটি। ঝরে পড়াদের তালিকা হলে তাদের ফিরিয়ে আনতে যেমন শিক্ষা প্রশাসনে পাশাপাশি সমাজ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে না। আর ঝরে পড়াদের হার প্রকাশ না হলে বোঝা যাবে না, শিক্ষার ওপর করোনার প্রভাব আসলে কতটা পড়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শিখতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেটা অবশ্য শিখন ঝুঁকির হিসাব। অর্থাৎ তারা করোনার দীর্ঘ বন্ধের সময়ে অনলাইন কিংবা দূরশিক্ষণ কোনোভাবেই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেনি। এর সঙ্গে ঝরে পড়ার সম্পর্ক রয়েছে। কারণ এসব শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিখন শূন্যতার কারণে পরবর্তী শ্রেণির পড়া ধরতে অসুবিধা হয়; সবার সঙ্গে পড়ায় তাল মেলাতে না পারলে অনেক সময় ঝরে পড়ে।

তবে করোনার কারণে ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। একটি হলো পরিবারের আর্থিক অসংগতি আরেকটি বাল্যবিয়ে। অবশ্য বাল্যবিয়েও প্রথম কারণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দৈনিক যুগান্তরের ২৯ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে এসেছে, এসএসসিতে যে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশই ছাত্রী। আশঙ্কা করা হচ্ছে এদের অধিকাংশই বাল্যবিয়ের শিকার। একই সঙ্গে পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক পরিবারই তাদের ছেলে ও মেয়েকে শিশুশ্রমে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।

করোনা-পরবর্তী শ্রেণি কার্যক্রম চালুর এ সময়ের মধ্যে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেমন ঝরে পড়ার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, তেমনি শ্রেণি কার্যক্রমেরও কোনো নড়চড় করা হয়নি। অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শ্রেণি কার্যক্রম চালুর ব্যাপারে অধিকাংশ শ্রেণি সপ্তাহে এক দিন ক্লাসের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, এ সময়ে তার পরিবর্তন হয়নি। কথা ছিল, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে ক্লাসের সংখ্যা বাড়বে। বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে কিন্তু ক্লাস ওই এক দিনই থেকেছে। এরই মধ্যে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর বার্ষিক পরীক্ষাও সেভাবে হয়েছে। এখন তারা আবার ছুটি কাটাচ্ছে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদেরও শীঘ্রই সেই ছুটি শুরু হয়ে যাবে। জানুয়ারি থেকে ক্লাস সংখ্যা বাড়ানোর কথা থাকলেও করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের শঙ্কায় তাও স্থগিত করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, শিক্ষাবর্ষের মূল্যবান এ সময়টা শিক্ষার্থীরা এভাবেই কাটাচ্ছে। অথচ শিক্ষাবিদরা শিক্ষাবর্ষটি লম্বা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

এটি ঠিক, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে যাওয়া আমাদের সাধারণ সমস্যা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'এনরোলমেন্ট' বাড়লেও এখনও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী ঝরে যায়। করোনাকালে ঝরে পড়ার হার বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, ঠিক কতটা বেড়েছে কিংবা আদৌ বেড়েছে কিনা সেটা বের করা দরকার। এ কাজটা শিক্ষা প্রশাসনের নিয়মিত কাজেরই অংশ। তারা চাইলে খুব সহজেই তা বের করতে পারে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক-দুই সপ্তাহের তথ্য জোগাড় করে ঝরে পড়াদের সংখ্যাটা বের করা কঠিন নয়। আমরা জানি, করোনার কারণে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানকার শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে কিনা সে হিসাবটাও প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ঝরে পড়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরানো সহজ হবে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারকে প্রণোদনা দিয়ে এবং বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীদেরও উপবৃত্তির আওতায় এনে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরাতে উদ্যোগ নিলে অনেকেই ফিরতে পারে। কিন্তু যদি ঝরে পড়াদের হিসাবই না থাকে, সে উদ্যোগ কীভাবে নেবে?

মাহফুজুর রহমান মানিক: সাংবাদিক ও শিক্ষা গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com