অবশেষে হত্যা মামলার প্রধান আসামি বন্দুকযুদ্ধে (?) নিহত হলো। তার আগে আরও দুইজন। তিনজনই এজাহারভুক্ত আসামি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুই বন্দুকযুদ্ধে তিনজন খরচ। আরও আসামি আছে পলাতক। তবে তদন্তকারী পুলিশই যাকে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড বা প্রধান পরিকল্পনাকারী বলে উল্লেখ করেছে তাকে মেরে ফেলার পর এই হত্যার ঘটনাটির মামলা কেমন চলবে আর বিচার-আচারই বা কী হবে? হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল, কে বা কারা পেছনে কলকাঠি নেড়েছে বা টাকা ঢেলেছে, কোনোকিছু কি সঠিকভাবে জানা যাবে? পুলিশ কি মামলা চালাতে উৎসাহী থাকবে? আট-দশ বছর পরে মামলাটির বিচার শেষ হয়ে যদি রায় বের হয়ও, তাহলেও কি রায়টি খুব আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে নেওয়া যাবে যে, ন্যায়বিচার হয়েছে ও প্রকৃত অপরাধীর সাজা হয়েছে? পেছনের গডফাদারদের যদি শনাক্ত করা না যায় বা না করা হয় তাহলে তারা নতুন নতুন ভাড়াটে খুনি সংগ্রহ করে কাজ চালানো থেকে ক্ষান্ত হবে কেন? রাজনীতি এখন বহুলাংশে দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়েছে দেশে।

বিশেষত জেলা-উপজেলা তথা তৃণমূল স্তরে সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে রাজনীতি নর্দমার তলে তলিয়ে যাচ্ছে। গত ২২ নভেম্বর কুমিল্লা নগরে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে বসা অবস্থায় হামলাকারী কয়েকজন অস্ত্রধারীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল। আরও মারা যান হরিপদ সাহা নামে তার একজন সহযোগী। এ ছাড়া পাঁচজন গুলিবিদ্ধ। সমকালের সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই খুনের পেছনেও এলাকায় মাদক ব্যবসা, রেষারেষি ও প্রতিহিংসা কাজ করেছে। সোহেলের ভাইয়ের দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত ১১ আসামির মধ্যে এই লেখার সময় পর্যন্ত পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পেরেছে, তিনজনকে বন্দুকযুদ্ধে হালাক করছে, এজাহারের বাইরে দু'জনকে ধরেছে। নিহত আসামি তিনজনই হলো প্রধান।

কথিত মাস্টারমাইন্ড শাহ আলম নিহত হন বুধবার মধ্যরাতে। তার আগে সোমবার মধ্যরাতে একই রকম বন্দুকযুদ্ধে মরেছিলেন সাব্বির হোসেন ও মোহাম্মদ সাজন নামে এজাহারের ৩ ও ৫ নম্বর আসামি। পুলিশ দেখে দেখে প্রধান আসামিদের মারছে কেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার কখনই স্বীকার করে না যে 'ক্রসফায়ার' বা 'এনকাউন্টার' বা হালের 'বন্দুকযুদ্ধ' বলে সরকারি নথিতে যাই লেখা হোক, এগুলো বিচার ছাড়া হত্যাকাণ্ড। ২০০৪ থেকে এরূপ শত শত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, ঘটে চলেছে। প্রতিটি ঘটনার পরে যে গদবাঁধা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হুবহু অনুরূপ বিবরণ দেওয়া হয় তার বিশ্বাসযোগ্যতা জনমনে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এলাকায় ক্রসফায়ারে নিন্দিত ও দুর্ধর্ষ কোনো অপরাধী মারা পড়লে এলাকার লোক অনেক সময় খুশি হয় ও সমর্থন করে। এই মনোভাব একাধারে পশ্চাৎপদ, আইনের শাসন সম্পর্কে অসচেনতাপ্রসূত, অদূরদর্শী এবং প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থারও প্রকাশ। ক্রসফায়ার যে বিচারবহির্ভূত হত্যা তা কয়েকজন সংসদ সদস্যই স্বীকার করে নিয়েছেন যখন সংসদে বলেছেন ধর্ষণের শাস্তি হওয়া উচিত ক্রসফায়ার!

সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষিত রাজনীতিবিদ যারই হোক এমন বিপজ্জনক মনোভাবকে কোনো সভ্য রাষ্ট্রের প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ক্রসফায়ার সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা স্মরণ করা যায় ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় টেকনাফের আওয়ামী লীগ দলীয় পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যু ও তার স্ত্রী-কন্যাদের এখনও অনুরণিত আর্তনাদে। এখন যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর রাশেদ মোহাম্মদ সিনহার বিচার হচ্ছে তাও ক্রসফায়ার-সংশ্নিষ্ট। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে অপরাধী বলে চিহ্নিত মানুষ মরে বিচারের আগেই। সংশ্নিষ্ট মামলাগুলোর মৃত্যু না ঘটলেও আহত, ক্ষতবিক্ষত হয়ে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে আইনি ও বিচার প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রীয়ভাবে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এই অপব্যবস্থা।