পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তার প্রিয় হাবিবকে 'সিরাজে মুনির' তথা প্রদীপ্ত এক দীপশিখা হিসেবে অভিহিত করেছেন। আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলে মনে হতে পারে যে, এত বড় মাপের একজন নবী যিনি মানবমণ্ডলীর মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত, তাকে সূর্যালোকের তেজোদীপ্ততার সঙ্গে তুলনা না করে একটা দীপশিখা, যা টিম টিম করে জ্বলে- তার সঙ্গে কেন তুলনা করলেন। সূর্য যতই তেজোদীপ্ত হোক, সে শতাব্দীকাল বা অনন্তকালের প্রচেষ্টায়ও কোনো দিন নতুন ছোট্ট আরেকটা সূর্যের জন্ম দিতে পারবে না, কিন্তু প্রদীপের কী ক্ষমতা দেখুন, একটা মাত্র প্রদীপ থেকে শত-সহস্র বা অসংখ্য-অগণিত নতুন প্রদীপ আলো নিয়ে নিজেদের উদ্ভাসিত করতে পারবে এবং এতে করে মূল প্রদীপের কোনো সমস্যাই হবে না। সেজন্য মহানবী (সা.) হলেন গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য এমন একটি নূর, যেটি হলো জ্ঞানের আলোকবর্তিকা; জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অনন্তকাল ধরে সব মানুষ তার কাছ থেকে আলোপ্রাপ্ত হয়ে নিজেদের অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করতে পারবে। সেজন্যই আরবের অন্ধকার দূর করার মানসে সর্বোত্তম এই নূরের প্রয়োজন ছিল। মহাজাগতিক প্রত্যাশার পারদ ভেঙে আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তাই প্রতিশ্রুত সেই নূরের আবির্ভাব ঘটল। আল্লাহপাক তার প্রিয় রাসুলকে জ্ঞানের আলোক-মশাল দিয়ে প্রেরণ করেছেন। কেননা, তদানীন্তন যুগ ও সমাজ ছিল জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞানতা আর মূর্খতায় পরিপূর্ণ। সেজন্যই আল্লাহ প্রদত্ত নূরের প্রতি অবতীর্ণ হওয়া ঐশী বাণীর প্রথম নির্দেশনাটিই ছিল- 'ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক' অর্থাৎ পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন। পড়া, অধ্যয়ন করা, জ্ঞানের চর্চায় নিজেকে নিবেদিত রাখা এবং সেই জ্ঞানের আলোকে চলমান অন্ধকারাচ্ছন্নতাকে মূলোৎপাটন করাই হলো সেই নূরের অন্যতম মাহাত্ম্য। মূর্খতার আঁধার দূর করতে হলে জ্ঞানের আলোকই হলো তার প্রকৃত উপকরণ। সেজন্যই বলা হয়েছে- 'আল ইলমু নুরুন' অর্থাৎ জ্ঞানই হচ্ছে নূর বা আলো এবং তার বিপরীতে অজ্ঞতা বা মূর্খতাই হচ্ছে অন্ধকার। মূলত মূর্খতা-অজ্ঞতার কারণে সেই সমাজ ছিল আঁধারে ঘেরা; স্রষ্টার পাঠানো মোহাম্মদি নূরের জ্ঞানসমৃদ্ধ আলোকচ্ছটায় সেই আঁধার শুধু তিরোহিতই হয়নি, বরং ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট যুগটি মানবেতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের মর্যাদা ও স্বীকৃতিও অর্জন করেছে।
মহানবী (সা.) ছিলেন শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রকৃষ্ট বাতিঘর। তিনি হলেন মানবতার শিক্ষক, যা তার বাণীতে পরিস্ম্ফুট হয়ে ওঠে- 'ইন্নামা বুইসতু মুআল্লিমান' অর্থাৎ আমাকে পাঠানো হয়েছে কেবল শিক্ষক হিসেবে। তিনি হলেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য কল্যাণকামী, পথনির্দেশনা দানকারী এক মহান শিক্ষক; যার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পরশে জঘন্য বর্বর ও পশুত্বের জগদ্দল পাথরও বিগলিত হয়ে যায়, সত্যের চাদরে আবৃত হয়ে জীবনকে সাফল্যের বনলতায় আচ্ছন্ন করতে বাধ্য হয়। তিনি নূর হয়ে এলেন, জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করে সর্বব্যাপী বিস্তৃত আঁধারকে তার আলোকমালায় উদ্ভাসিত করলেন; অথচ সেজন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত শিক্ষার্জন তার ছিল না। এজন্য ছিল না যে, পৃথিবীর মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত, সামান্য। মহান আল্লাহই বলেছেন, 'ওয়ামা উতিতুম মিনাল ইলমে ইল্লা কালিলা' অর্থাৎ আমি তোমাদের খুব সামান্যতম জ্ঞান দিয়েছি। সামান্যতম জ্ঞানের অধিকারী মানুষ সেই বিশ্বমানবকে কী শেখাবে বা কী পড়াবে, যিনি হবেন সমগ্র বিশ্বমানবতার শিক্ষক! তাই অসম্পূর্ণ বা অপরিণত জ্ঞানের অধিকারী মানুষের কাছ থেকে মহানবী (সা.) কিছু জানেননি, শেখেননি বা পড়েননি; মহান আল্লাহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে তার এই মহান দূতকে শিক্ষা ও জ্ঞান দিয়েছেন। আর প্রকৃত প্রস্তাবে কেবল আল্লাহর জ্ঞানই হচ্ছে পরিণত, পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। মানবতার পরম সুহৃদ মোহাম্মদ (সা.) জ্ঞানে-গুণে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে, দৈহিক অবয়বে, গঠনাকৃতিতে, ভাব-ব্যঞ্জনায়, অলৌকিকত্বে, ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী জাদুময়তায়, আদর্শিক চেতনায়, ইমানে-ইনসাফে, আচার-ব্যবহারের মাধুর্যতায়, সল্ফ্ভ্রান্ত বংশ পরম্পরায়, কর্মদক্ষতা-বিচক্ষণতায়, মহান কীর্তিতে-সাফল্যে- সর্বোপরি মানবতার সব দিক ও বিভাগের পরিপূর্ণতায় সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের বাস্তব ও অনবদ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্ব-ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় সমাসীন রয়েছেন। তারই অসামান্য নূরের পরশে দূর হয়েছে সব আঁধার- তাই তো তিনি চির অম্লান তারই নূরের রৌশনিতে; তিনিই যে আঁধার বিশ্বের আলোকবর্তিকা।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন:চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়