মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হচ্ছে রোববার থেকে। ওই দিন দেশটির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে শুক্রবার সকালে প্রবাসীকল্যাণ ভবনে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ।

মন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় চার বছর পর শ্রমবাজার উন্মুক্ত হচ্ছে। রোববার এ বিষয়ে দেশটির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সম্প্রতি গ্রিসের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি আগ্রহপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। 


একইভাবে আলবেনিয়া, মাল্টা ও বসনিয়ার সঙ্গে কর্মী পাঠনোর বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়াসহ আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশ এবং জাপান, চীন, ক্রোয়েশিয়া, সেনেগাল, বুরুন্ডি, সিশেলস, মালয়েশিয়ার সারওয়াক প্রভৃতি দেশে কর্মী পাঠনো শুরু হয়েছে। 

২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ফিরে মাহাথির মুহাম্মদ সরকার নাজিব রাজাকের আমলে সই হওয়া জিটুজি প্লাসে কর্মী নিয়োগে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। এরপর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত তিন বছরে কয়েকবার মালয়েশিয়ার বাজার খোলার খবর শোনা গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও কর্মী নিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনা হয়। তখন মালয়েশিয়ার প্রস্তাব ছিল সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৫০টি এজেন্সি কর্মী পাঠাবে। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল কমপক্ষে আড়াই থেকে তিনশ এজেন্সিকে যুক্ত করার। ইমরান আহমদ সমকালকে বলেছেন, তিনি আশা করছেন এবার এমওইউ হলে সব এজেন্সিই কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। সিন্ডিকেট হবে না।


২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ান মন্ত্রী ঢাকায় এসেছে বাজার খোলার ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। অতীতে কৃষি ও প্লান্টেশন খাতে বাংলাদেশ থেকে অধিক সংখ্যক কর্মী নিয়েছে মালয়েশিয়া। এসব খাতে বিদেশি শ্রমিকদের মানবেতর পরিবেশে বেশি কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। ইমরান আহমদ বলেছেন, এবার সব খাতই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।

জিটুজি প্লাসে মালয়েশিয়ায় থাকা ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করা হতো। এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুষের বিনিময়ে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমের কর্মী নিয়োগ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। ইমরান আহমদ বলেছেন, আগামীতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোই কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র আনবে। সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। কর্মীরা যেন প্রতারিত-নির্যাতিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকার নজরদারি করবে।

মালয়েশিয়ার জটিল রাজনীতি এবং দুর্নীতি বাংলাদেশ থেকে কর্মী অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) জোট ক্ষমতায় থাকতে জিটুজি প্লাস সই হয়েছিল। জোটটি তিন বছর পর ফের মালয়েশিয়ার শাসন ক্ষমতায় ফিরেছে। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি এখন জোটের চেয়ারম্যান। তার ভাই আবদুল হাকিম হামিদির প্রতিষ্ঠান ছিল জিটুজি প্লাসে কর্মী নিয়োগের মূল নিয়ন্ত্রক। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষের বিষয়ে কর্মী নিয়োগের অভিযোগ ছিল। হামিদি পরিবার ক্ষমতায় ফেরার পর ফের বাংলাদেশিদের জন্য খুলতে যাচ্ছে মালয় শ্রমবাজার।


দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভান গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে বলেছেন, বৃক্ষরোপণ, কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, সেবা, খনি, নির্মাণ ও গৃহকর্মী সব খাতেই বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ করা হবে। করোনার বিস্তার রোধে শ্রমিক নিয়োগের বিধিবিধান (এসওপি) নির্ধারণ করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মালয়েশিয়া পৌঁছে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হতে পারে।

কী কী শর্তে কর্মী নিয়োগ হবে- তা সমঝোতা স্মারকে ঠিক হবে বলে জানিয়েছেন ইমরান আহমদ। মালয়েশিয়ায় যেতে কতটা টাকা খরচ হবে, কর্মীরা কেমন বেতন পাবেন- এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সমকালকে জানান, মালয়েশিয়ায় সর্বনিম্ন মজুরি এক হাজার ২০০ রিঙ্গিত (২৪ হাজার ৪২০ টাকার সমপরিমাণ)। বাংলাদেশ থেকে কর্মী যেতে পারলে বেতন এক হাজার ২০০ রিঙ্গিতের কম হবে না।

প্রসঙ্গত, মালয়েশিয়া সরকারের পছন্দ করা বাংলাদেশের ১০টি মাত্র রিক্রুটিং এজেন্সি এই কর্মীদের পাঠায়। এই এজেন্সিগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পেয়েছিল। জিটুজি প্লাস ৩৭ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও কর্মীপ্রতি তিন থেকে চার লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে।