বীরবিক্রম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নীলমণি সরকারের বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই ইউনিয়নের পালপুর গ্রামে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩ ডিসেম্বর কানাইঘাটের এক যুদ্ধে সম্মুখসমরে তিনি শহীদ হন। তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরবিক্রম খেতাব প্রদান করে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নীলমণি সরকার ছিলেন সিলেট সদর উপজেলার কুচাই ইছরাব আলী উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন এই উদীয়মান তরুণ এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরীক্ষার আগেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তাই পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তার। চলে যান মুক্তিযুদ্ধে।

নীলমণির ইছরাব আলী স্কুলটির সঙ্গে বর্তমানে কলেজ সংযুক্তি করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এই স্কুল অ্যান্ড কলেজে গেলে অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন আহমদ নীলমণি সরকারের বীরত্বের কাহিনি ও বর্তমান তার বাড়িঘরের অবস্থান তুলে ধরেন এবং স্কুল লাইব্রেরি থেকে স্বাধীনতার দলিলপত্র ১০ খণ্ড এনে নীলমণি সম্পর্কে পড়তে দেন। এই গ্রন্থের ২৪১ পৃষ্ঠায় সেক্টর কমান্ডার সি. আর. (চিত্তরঞ্জন) দত্তের সাক্ষাৎকারে নীলমণির বীরত্বের কাহিনি সন্নিবেশিত আছে। এসব জানার পর তার বাড়ি পরিদর্শন করার আগ্রহ জন্মে। সহকারী প্রধান শিক্ষক কয়েছ আহমদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করলে তিনি তার বাড়িতে যেতে খুব আগ্রহ দেখালেন।

সিলেট-গোলাপগঞ্জ রোডে আলমপুর পেরিয়ে ডানদিকে পালপুর গেট। প্রায় দেড় মাইলের রাস্তার অর্ধেকের চেয়ে বেশি রাস্তা পাকা হলেও শহীদ নীলমণি সরকারের বাড়ির সন্নিকটের রাস্তা এখনও কাঁচা। বাড়ির সামনে যেতেই ডান দিকে চোখে পড়ে স্থানীয় সরকার কর্তৃক নির্মিত ছোট একটি স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধের পাশেই রয়েছে ছোট দুটি নাটমন্দির। একটু এগিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ল একটি অর্ধনির্মিত পাকা ঘর। আমাদের দেখে এগিয়ে আসেন শহীদ নীলমণির এক কাকাতো ভাই। নীলমণির পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার বাবার নাম অতুল বিশ্বাস এবং মায়ের নাম মনোদা বিশ্বাস।

নীলমণির পাঁচ কাকার মধ্যে ছোট কাকা সত্যেন্দ্র বিশ্বাস এখনও জীবিত। তিনি জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিলেটে সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা শুরু করলে বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায়। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন আমাদের গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ করে। আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিই। এই ঘটনা নীলমণির কানে গেলে সে স্কুল থেকে আর বাড়ি ফেরেনি, চলে যায় ভারতে। পরবর্তী সময়ে আমরাও ভারতে পালিয়ে রক্ষা পাই। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা (প্রথম খণ্ড) ও উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, ভারতে গিয়ে নীলমণি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মুক্তিবাহিনীতে নাম দেওয়ার জন্য বারবার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যান। বয়স কম অজুহাতে তাকে প্রথমে মুক্তিবাহিনীতে নেওয়া হয়নি। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর তাকে মুক্তিবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতের শিলচরের ধালচরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর নীলমণি যুদ্ধ করেন চার নম্বর সেক্টরের আমলসিদ সাব-সেক্টরে। এই সাব-সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন লে. জহিরুল হক। তার অধীনে তিনি বেশ কয়েকটি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। কানাইঘাট, সুরমাসহ আরও কয়েকটি ছোট ছোট নদী এবং অনেক খালবিল ও ছোট ছোট পাহাড়ঘেরা এলাকা। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের সিলেট অভিমুখে অগ্রাভিযানের জন্য কানাইঘাট মুক্ত করা ছিল জরুরি।

কানাইঘাটে পাকিস্তানিরা তখন শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল ৪নং সেক্টরের কমান্ডার চিত্তরঞ্জন দত্ত, জামালপুর সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রহমান রব সাদী এবং অমলসিদ সাব-সেক্টরের লেফটেন্যান্ট জহিরের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা দরবস্ত-কানাইঘাট এবং চরঘাট-কানাইঘাট সড়কের ওপর ব্লকিং পজিশন করার জন্য অগ্রসর হন। নীলমণি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জহিরের নেতৃত্বাধীন দলে। ওই দলের বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা অগ্রসর হওয়ার পথে পাকিস্তানি সেনাদের আকস্মিক আক্রমণের মুখে পড়েন। প্রচণ্ড গোলাগুলির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে এবং সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। নীলমণিসহ কয়েকজনের সাহসিকতার পরও মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগোতে ব্যর্থ হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাগুলিতে শহীদ ও আহত হন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।

একপর্যায়ে বাঙ্কারে থাকা নীলমণি মাথা তুলে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে গ্রেনেড নিক্ষেপের চেষ্টা করেন। এমন সময় গুলি এসে লাগে তার মাথায়। শহীদ হন অকুতোভয় কিশোর যোদ্ধা নীলমণি। পরে তার মরদেহ সমাহিত করা হয় কানাইঘাটেই।

আবু সালেহ আহমেদ : লেখক ও লোক গবেষক