আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা দেখেছি, রাজশাহী মহানগরী ছিল মরুভূমির নিকটবর্তী কোনো এক শহরের মতো। গ্রীষ্ফ্মকালে একটু জোরে বাতাস প্রবাহিত হলে আগুনের তাপ অনুভব করতাম। পদ্মার বালু জমত আমাদের বিছানায়। সারা শহরে কিছু আম গাছ ব্যতীত তেমন কোনো গাছ ছিল না। তথচ সেই শহর এখন বৃক্ষ, ফল ও ফুলে পরিপূর্ণ। সড়কদ্বীপ ও পদ্মার পাড় দিয়ে কী সুন্দর করে গাছ লাগানো হয়েছে। দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম একটি সুন্দর শহরে পরিণত হয়েছে। মেডিকেল কলেজের পেছনে বর্ণালির রাস্তায় ফুটপাতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছাতিম গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি গাছ এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গেছে। ছাতিম গাছ আমাদের দেশীয় গাছ। প্রাপ্ত বয়স্ক একটি গাছ ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে ছাতার মতো আকার ধারণ করে; তাই হয়তো এর নাম হয়েছে ছাতিম। ছাতিম ফুলের গন্ধে মাদকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফুটপাত ও সড়কদ্বীপে এ দেশি গাছটির সফল 'প্লান্টেশন'-এর উদ্ভাবক রাজশাহীর মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু ক্যাবিনেটের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের সুযোগ্য পুত্র।

রমনা পার্ক, ওসমানী উদ্যান ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকা মহানগরীর প্রাণ ও অক্সিজেনের উৎস। এখান থেকে যে পরিমাণ অক্সিজেন উদ্‌গিরণ হয়, তা মহানগরীকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে। তা না হলে দিল্লির মতো অবস্থা হতো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে, তাতে অচিরেই এটি বৃক্ষশূন্য হবে। উদ্যানে নতুন করে গাছ লাগানোর সুযোগ থাকলেও তা লাগানো হচ্ছে না। ওসমানী উদ্যানটিও প্রায় বৃক্ষশূন্য।

সবচেয়ে বড় বিপদে আছে পাখিরা। তাদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে দিন দিন। নিরাপদ আশ্রয় ও বংশবিস্তার করতে পারছে না। প্রতিদিন ঢাকা শহরে পাখির সংখ্যা কমছে। পাখিদের আরেক উপদ্রব হলো, নগরীর ছিন্নমূল টোকাইরা। কোনো কাজ বা পড়ালেখা না থাকায় সারাদিন তারা পার্কের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। পাখির ডিম ও বাচ্চা সংগ্রহ তাদের অন্যতম কাজ। এগুলো দেখার মতো সিটি করপোরেশনের কোনো জনবল নেই। পাখিরা নিরাপদে বংশবিস্তার করতে পারছে না। প্রজনন মৌসুমে পাখিদের নিরাপদ বংশবিস্তারের জন্য সিটি করপোরেশনের উচিত পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া।


ঢাকা মহানগরীতে উল্লেখযোগ্য সড়ক দ্বীপ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দ্বীপে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষ, লতা, গুল্ম লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি বিদেশ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই নানা ধরনের বিদেশি গাছ এনে সড়কদ্বীপে লাগানো হয়েছে। আমরা দেখেছি, হঠাৎ করে বিমানবন্দর সড়কে বিদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশি গাছ এনে রোপণ করা হয়েছে। অথচ এসব বিদেশি গাছ আমাদের জলবায়ুতে টিকে থাকতে পারে কিনা, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এক বছর পার না হতেই সড়কদ্বীপে রোপিত সব গাছ মরে শেষ। তিনটি কারণে সড়কদ্বীপে গাছ রোপণ ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রথমত, সড়কদ্বীপের জায়গাটি এত অপর্যাপ্ত যে, এখানে একটি বৃক্ষের শিকড় ভালোভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে না। যে কারণে সামান্য ঝড় বা ঘূর্ণি বাতাসে লাগানো বৃক্ষ কুপোকাত। দ্বিতীয়ত, খরার সময়ে পানি দেওয়ার মতো কেউ না থাকায় পানির অভাবে গাছগুলো মরে যায়। তৃতীয়ত, গ্রীষ্ফ্মকালে সড়কদ্বীপের বৃক্ষের পাতাগুলোতে ধুলা এমনভাবে আটকে থাকে যে, বৃক্ষগুলো সালোকসংশ্নেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করতে পারে না। ফলাফল যা হওয়ার তাই খাদ্য ও পানির অভাবে গাছগুলো অকালে মৃত্যুবরণ করে।

সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের এদিকে নজর আছে বলে মনে হয় না। পরের বছর আবার মহাসমারোহে নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে। যেন সরকারি অর্থ অপচয়ের এক মহোৎসব। সিটি করপোরেশন থেকে মাঝে মধ্যে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, তা পর্যাপ্ত নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যাদের পর্যাপ্ত লরি নেই, কী করে তারা গাছে পানি দেবে?

হজের সময় মরুভূমি সমতুল্য আরাফাহ ময়দানে গেলে দেখা যায়, সৌদি রাজকীয় সরকার এখানে প্রচুর সংখ্যক নিম গাছ লাগিয়েছে। প্রতিটি গাছে পরিচর্যা ও পানি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে প্রাকৃতিক নিয়মেই নিম গাছ জন্মে। কোনো ধরনের পরিচর্যা বা পানি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। চীন ও জাপানে দেখেছি, বড় বড় গাছ বিশেষ পদ্ধতিতে তুলে এনে শহরের ফুটপাত বা সড়কদ্বীপে লাগানো হয়েছে। প্রতিটি গাছ তারা শিশুর মতো পরিচর্যা করে। সেখানে তো গাছ এভাবে মরে না।

আমদের দেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক দেশীয় বৃক্ষ- যেগুলো পরিবেশবান্ধব। প্রতিকূল পরিবেশে তারা টিকে থাকতে পারে। পানি ছাড়াও অনেক দিন বাঁচতে পারে। অন্যদিকে পাখিদের খাদ্য হিসেবে এসব গাছের ফল উপাদেয়। কয়েকটি গাছের নাম ও পরিচয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। শেওড়া গাছ, এটি ছোট আকারের চিরসবুজ গাছ। ঘন ডালপালার এই গাছের উচ্চতা ৪-১০ মিটার। গাছের পাতাগুলো খসখসে। ফলগুলো হলুদ ও বেরি ধরনের। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ভারতে এই গাছ দেখা যায়। আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরির কাজেও এই গাছের ব্যাপক ব্যবহার আছে। বিশেষ করে দাঁতের ব্যথা, ডায়রিয়া, কুষ্ঠরোগ, ক্যান্সার প্রভৃতি রোগের ওষুধ তৈরিতে এই গাছ ব্যবহূত হয়ে থাকে।

ছাতিম গাছ, এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ক্রান্তীয় অঞ্চলের এ গাছটি বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে জন্মে। সাধারণত কর্দমাক্ত স্থানে এ গাছ বেশি জন্মে। তবে যে কোনো পরিবেশে এটি খাপ খাওয়াতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য উদ্ভিদ হলো ছাতিম। ছাতিম গাছের প্রচুর ঔষধি গুণ রয়েছে। এর বাকল শুকিয়ে পানিতে ভিজিয়ে সেবন করলে হার্টের রোগ ভালো হয়। তাছাড়া ক্ষত শুকানো, ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ হিসেবেও এটি ব্যবহূত হয়। হিজল গাছ, এটি মাঝারি আকারের ডালপালা ছড়ানো দীর্ঘজীবী গাছ। বীজ থেকে গাছ হয়। উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ মিটার। হিজল মাঝারি ধরনের। ডালপালার বিস্তার চারদিকে। সাধারণত জলজ কাদা, পানিতে এই গাছ জন্মে। তবে যে কোনো পরিবেশে এটি খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বাকল ঘনছাই রঙের ও পুরু। হিজলের বিষাক্ত অংশ হলো ফল, যা মারাত্মক বমনকারক। হিজল গাছের আদি নিবাস বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।

ডুমুর ৮৫০টিরও অধিক কাঠজাতীয় গাছের প্রজাতি বিশেষ। এ প্রজাতির গাছ, গুল্ম, লতা ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে ডুমুর গাছ বা ডুমুর নামে পরিচিত। ছোট ডুমুর গাছ গ্রামগঞ্জে অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠে। জগডুমুর বা যজ্ঞ ডুমুর নামের ডুমুরু গাছ অনেক বড় হয়। এ ডুমুর পাকলে এর ফল লাল রঙের হয়। পাখিরাই প্রধানত এই ডুমুর খেয়ে থাকে এবং পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে বীজের বিস্তার হয়ে থাকে। এটি এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। ডুমুর নরম ও মিষ্টি জাতীয় ফল। ফলের আবরণ ভাগ খুবই পাতলা এবং এর অভ্যন্তরে অনেক ছোট ছোট বীজ রয়েছে। এর ফল শুকনো ও পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়। উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে এ প্রজাতির গাছ জন্মে। কাঁচা ডুমুর তরকারি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়।
নিমগাছ একটি ঔষধি গাছ; যার ডাল, পাতা, রস সবই কাজে লাগে। নিম একটি বহুবর্ষজীবী ও চিরহরিৎ বৃক্ষ। আকৃতিতে ১২-১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কাণ্ডের ব্যাস ৫০-৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। নিমগাছে এক ধরনের ফল হয়। আঙুরের মতো দেখতে, এই ফলের একটিই বীজ থাকে। জুন-জুলাইয়ে ফল পাকে এবং কাঁচাফল তেতো স্বাদের হয়। তবে পেকে হলুদ হওয়ার পর মিষ্টি হয়। ভারত এবং বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই নিমগাছ জন্মে। প্রাপ্ত বয়স্ক হতে সময় লাগে ১০ বছর। নিমগাছ সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়াপ্রধান অঞ্চলে ভালো হয়। নিমের পাতা থেকে বর্তমানে প্রসাধনীও তৈরি হচ্ছে। কৃমিনাশক হিসেবে নিমের রস খুবই কার্যকরী। নিমের কাঠ খুবই শক্ত। এই কাঠে কখনও ঘুণ ধরে না। পোকা বাসা বাঁধে না। উইপোকা খেতে পারে না। এই কারণে নিম কাঠের আসবাবপত্রও বর্তমানে তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই বাদ্যযন্ত্র বানানোর জন্য কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। নিমের এই গুণাগুণের কথা বিবেচনা করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে 'একুশ শতকের বৃক্ষ' বলে ঘোষণা করেছে।

ঢাকা মহানগরীর সড়কদ্বীপগুলোতে এসব দেশীয় বৃক্ষ লাগানো যেতে পারে। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় কম হবে, পরিবেশ বিপর্যয় থেকে মহানগর রক্ষা পাবে ও পাখিদের ক্ষুধা নিবারণ করা যাবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।

শেখ ইউসুফ হারুন :সিনিয়র সচিব; নির্বাহী চেয়ারম্যান,বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)