সম্প্রতি মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার টম অ্যান্ড্রুস বাংলাদেশ সফরকালে কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার যুক্ততার বিষয়ে তথ্য থাকার দাবি করেছেন। পরে অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার এ দাবি নাকচ করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ এবং আরও ছয় রোহিঙ্গা নেতা খুনের পর থেকে কক্সবাজারে আরসা তথা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির উপস্থিতির বিষয়টি জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এখানে আরসার উপস্থিতি এখনও না থাকলেও আমাদের সতর্কতার বিষয় রয়েছে অবশ্যই।
মিয়ানমারে ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর হারাকা আল-ইয়াকিন নামে যাত্রা শুরু করে বিদ্রোহী গ্রুপটি। পরে তারা আরসা নামে কাজ করে। সশস্ত্র এই গ্রুপটি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করে। তবে ২০১৬ সাল থেকে তাদের অবস্থান বড় আকারে প্রকাশ পায়, যখন এর সদস্যরা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের ওপর হামলা করে। ওই হামলায় মিয়ানমারের ৯ পুলিশ সদস্য প্রাণ হারায়। অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে আরসার যোগাযোগ রয়েছে। তারা গেরিলা পদ্ধতিতে হঠাৎ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট তাদের হামলায় ১২ নিরাপত্তারক্ষী মৃত্যুবরণ করেছিল। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা এতটাই বাড়িয়ে দেয় যে, জাতিসংঘ তাকে জাতিগত হত্যার 'টেক্সটবুক' উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে। যার ফলে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ওই সময় বিশেষ করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ওই ঘটনায় সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেয়। সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরসার নেতৃত্বে আছেন পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আতাউল্লাহ, যিনি আবু আম্মার নামেও পরিচিত।
আরসা নানা কারণে বাংলাদেশে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমরা জানি, মিয়ানমার সরকার বারবারই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে 'পুশ' করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এক ধরনের নিরাপত্তহীনতা তারা জিইয়ে রেখেছে। মিয়ানমার থেকে মাদক ও অস্ত্র আসছে। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার কথা আমরা বলেছি। তার হত্যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্প আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সেখানে অন্য যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, সেসব পরিবার হত্যার জন্য আরসাকে দায়ী করছে।
সম্ভাব্য তিনটি কারণে আরসা বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রথমত, আরসা বাংলাদেশে শিকড় গাড়তে চায়, যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তাদের উপস্থিতি সাড়া ফেলে এবং ফান্ডিংয়ে সুবিধা করতে পারে। আরসা সশস্ত্র গোষ্ঠীটি হারাকাহ আল ইয়াকিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যাদের অতীতে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং মালয়েশিয়া সহযোগিতা দিয়েছিল। আরসা নেতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনজুনি এলিয়াস হাফিজ তোহা পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। আতাউল্লাহর পিতা-মাতা ১৯৬০ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে করাচি চলে যান। সূত্রমতে, আতাউল্লাহ তোহার অনেক জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। আইএসআই, আরাকান হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী এবং লস্কর-ই তৈয়বা তার কাজে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে আতাউল্লাহ তোহা শুধু অস্ত্রের জোগানই পাননি; একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতাও লাভ করেছেন।


আতাউল্লাহ তোহা আরসার জন্য সম্ভাব্য দুটি নিরাপদ ঘাঁটি বিবেচনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে, যার একটি থাইল্যান্ডের মায়ে সাই, অন্যটি বাংলাদেশের কক্সবাজার। ২০১৩ সালে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। বলাবাহুল্য, আরএসও বা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের জন্যও নব্বইয়ের দশকে কক্সবাজার ছিল 'নিরাপদ' ঘাঁটি। আরএসও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পও স্থাপন করে। কক্সবাজারে উল্লেখযোগ্য এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে বলে ফান্ড নেওয়া কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। বিশেষ করে ইসলামী দেশগুলোর সংস্থার ফান্ড পাওয়া সহজ। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের আল-হারামাইন আল-খাইরিয়া, ইউনাইটেড আরব আমিরাতের আল ফুজাইরিয়া ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুসারে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আরসার উল্লেখযোগ্য তথ্যদাতা (ইনফরমার) রয়েছে। তাদের মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরগুলোতে যা ঘটছে সেসব তথ্য আরসা সংগ্রহ করছে। সাধারণ মানুষ বা সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছে আরসা হুমকিস্বরূপ। তারা আরসার কারণে অনিরাপদ বোধ করে। প্রতিবেদনমতে, জামা'আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) কক্সবাজারে ৪০ রোহিঙ্গাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। আরসার প্রশিক্ষণ ও ফান্ডিংয়ের জন্য বাংলাদেশকে আরসা নিরাপদ মনে করে। এটাই বাংলাদেশের নিরাপত্তায় হুমকির প্রথম কারণ।
হুমকির দ্বিতীয় কারণ, সীমান্তে মাদক, মানব পাচার ও অস্ত্রের ব্যবসা, যা আরসা অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমার এমনিতেই আফিম উৎপাদন এবং চালানের উর্বর ক্ষেত্র। ইউএনওডিসির তথ্যমতে, ২০২০ সালে মিয়ানমারে ৪০৫ টন আফিম উৎপাদিত হয়েছে। মিয়ানমারের দক্ষিণাংশে উল্লেখযোগ্য আফিম চাষ হয়। এ চাষ কমলেও মাদক সিন্ডিকেট, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য মহামারির সময়কে ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে। মিয়ানমারে বর্তমান সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে রয়েছে। তাই পরোক্ষভাবে তারা অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে মাদক ব্যবসাকে ব্যবহার করছে। মিয়ানমার 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল রুট' ব্যবহার করে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ওআরএফের প্রতিবেদন অনুসারে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কাছে ইয়াবা বিক্রি করে। এর সঙ্গে আরসার সদস্যরাও জড়িত। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো এখন মাদক ব্যবসা এবং প্রভাব খাটানোর যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে কয়েকটি গ্রুপ ক্যাম্পের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এ নিয়ে নানা সময় দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আসছে।
হুমকির তৃতীয় কারণ, মিয়ানমার সরকার আরসা ইস্যু ব্যবহার করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এবং বৈশ্বিক মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে চায়। তা ছাড়াও, মিয়ানমার আরসাকে ব্যবহার করে তাদের রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিষয়কে ন্যায্যতা দিতে চায়। আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাৎমাদো বা সামরিক জান্তা সরকারের অনিচ্ছা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তৃতীয় প্রত্যাবাসন বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সামরিক জান্তা সরকারের কারণে তার কোনো অগ্রগতি নেই। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরসা উপস্থিতির অজুহাত সামনে এনে আবারও প্রত্যাবাসন থেকে পিছিয়ে গেছে। মিয়ানমারের দাবি, আরসা কক্সবাজার ক্যাম্পে রয়েছে, যারা রোহিঙ্গাদের রাখাইন যেতে বাধা দিচ্ছে। বস্তুত মিয়ানমার আরসা প্রপাগান্ডা করে প্রত্যাবাসন বন্ধ করতে চায়।
মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অসহযোগিতার জন্য প্রত্যাবাসন বিষয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী হতাশ ও অসহায়। আরসা রোহিঙ্গাদের এই দুর্দশার ফলে উপকৃত হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক খেলা এবং সীমান্ত সংকট আরসার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে উপকৃত করছে, যেটি পক্ষান্তরে বাংলাদেশকে হুমকিতে ফেলছে।
ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়