বিদায়ী ২০২১ সালের কূটনৈতিক যাত্রার শুরুটা হয়েছিল নতুন সম্ভাবনার ইতিহাস রচনার বিপুল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এই বছরটা ছিল বাংলাদেশের জন্য, বাঙালি জাতির জন্য অনন্য গৌরবের বছর। স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বর্ণাঢ্য উদযাপনে বন্ধু অনেক রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা এসেছেন। যারা আসতে পারেননি, তারা শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে এই উদযাপন উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও বন্ধুত্বের নতুন দিগন্তের পথ খুলে দিয়েছে। একইসঙ্গে এই বছরে বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেওয়া অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও ভুটানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ পূর্তিরও বছর।  

বিদায়ী বছরে মার্চের ১৭ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অভূতপূর্ব আয়োজনে অংশ নিতে ঢাকা সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা.লোটে শেরিং এবং মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। ৬০টির বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং শীর্ষ নেতারা শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান। একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের আয়োজন উপলক্ষে এই বিপুল সাড়া বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

বছরের শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা সফর করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। একই বছরে কোনো দেশে ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধামন্ত্রীর সফরের ঘটনাও এই প্রথম। 

বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারত। একাত্তরে বাংলাদেশের পাশে সর্বোতভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ভারত, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবনও দিয়েছেন ভারতীয় সেনারা। এই রক্তের বন্ধনে বাঁধা সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ভারত। আর বাংলাদেশ দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক অগ্রগতির দেশ। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সহযোগিতার সম্পর্ক তাই পুরো দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। 

বছরের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং বছরের শেষে ভারতের রাষ্ট্রপতি ঢাকায় এসে জোর দিয়ে বলে গেছেন, ভারতের কাছে প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশই প্রধান, বাংলাদেশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বর্তমানে সোনালী অধ্যায় চলছে বলেও বর্ণনা করেছেন তারা। একইসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার আরও চারটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতেও আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব অর্জন করেছে, সন্দেহ নেই।

বিশ্বজুড়ে সারা বছর ধরেই বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন হয়েছে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি করে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা সৃষ্টির দিকগুলোও তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে একদিকে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশে বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসার পথও সুগম হয়েছে।  

কূটনীতিতে অনেক বড় অর্জনের বছর হলেও এ বছরও রোহিঙ্গা কূটনীতি আগের মতই তিমিরে থেকে গেছে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নানা আলোচনা-সমালোচনার পর জাতিসংঘ শেষ পর্যন্ত ভাসানচরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনায় সম্মতি দিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এর মধ্য দিয়ে একটা সাফল্য আসলেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো অগ্রগতিই ছিল না। বরং বছরের শুরুতেই মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান এবং জান্তা সরকার ক্ষমতা দখল করার কারণে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা আরও সুদূর পরাহত হয়ে যায়। যদিও সামরিক অভ্যুত্থানের শুরুতে অনেকের ধারণা ছিল পশ্চিমাদের সমর্থন লাভের আশায় মিয়ানমারের জান্তা সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত সম্পন্ন করবে। কিন্তু সেই ধারণা বাস্তবে সত্যি হয়নি।

ভাসানচরে রোহিঙ্গারা। ছবি: সমকাল

জান্তা সরকার বরং আন্তর্জাতিক সব ধরনের আহ্বান, অনুরোধ, সমালোচনা এমনকি নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে সামরিক ক্যু বিরোধী গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে রক্তাক্ত দমন অভিযানে ব্যস্ত ছিল বছর জুড়েই। বছর শেষে আরও প্রকাশ হয়, মিয়ানমারের জান্তা সরকার ২০২১ সালের জুলাই মাসে মধ্যাঞ্চলের সাগাইং এলাকায় আবারও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা চালিয়েছে। ফলে মিয়ানমারের এই জান্তা সরকারের আমলে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি একেবারেই ফিকে হয়ে যায়। কারণ এই সভ্য সময়ে নিজের দেশের ভেতরে একের পর এক গণহত্যা চালানোর পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যত নিরব, নিশ্চুপ ভূমিকাই গভীর হতাশার সৃষ্টি করে। এমনকি মানবাধিকারের জন্য সোচ্চার প্রভাবশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কার্যকর, কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। 

বছর শেষে বাংলাদেশের সামনে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসে যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে নেতিবাচক তথ্য ও পর্যবেক্ষণ উঠে আসছিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপিত জানানো হলেও পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট দেশ ও সংস্থা তাদের অবস্থানেই অটল ছিল। এরই সর্বশেষ ও বড় প্রকাশ দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। 

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলনে ১১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত আসার পর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভেতরে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে কি’না তা নিয়েও নানামুখী গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ না জানানো কিংবা রাজস্ব বিভাগের নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং যৌথ সহযোগিতার সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে। 

অবশ্য কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জো বাইডেন প্রশাসন বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতাকে সামনে রেখে নতুন অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ঠেকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর অবস্থানকে আরও জোরালো করতে বাইডেন প্রশাসনকে ব্যাপক তৎপর দেখা যাচ্ছে। সেই তৎপরতার অংশ হিসেবে বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনেও সংশোধনী আনছে। এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ আইন হচ্ছে ১৯৬১ সালের লিহেই আইন। এই আইনের আওতায় সামরিক অনুদানের ক্ষেত্রেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শর্ত জোরালোভাবে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের তৎপরতায় চীনও নতুন করে কোনো পদক্ষেপ নিতেই পারে। এ অবস্থায় নতুন বছরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধ বিশ্ব রাজনীতিতে আরও প্রকট হওয়ার প্রেক্ষপটে বাংলাদেশের মত অর্থনীতির দেশগুলোর সামনে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে।