মানুষ জন্মলাভ করল, নির্দিষ্ট আয়ুস্কাল নিয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করল, অতঃপর স্রষ্টার অমোঘ বিধানে পরপারের যাত্রী হয়ে ইহধাম ত্যাগ করল- এখানেই মানবজীবনের পরিসমাপ্তি নয়, কিংবা এতেই মানব সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণ হয় না। বরং সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনেই মানুষের সৃজন, প্রেরণ ও প্রতিপালন। নির্ধারিত মেয়াদে মানুষকে ইহজগতের অধিবাসী রেখে কিছু সংবিধিবদ্ধ বিষয়ে তাকে পরীক্ষা করাও মহান রবের অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে, সাফল্যের পরিচয় দেবে; তাদের জন্য রয়েছে মহান স্রষ্টার প্রণোদনা, পুরস্কার ও সুসংবাদ। পরম স্রষ্টা কর্তৃক গৃহীত মানবজীবনের এসব পরীক্ষা ও প্রাপ্ত সুসংবাদ সম্বন্ধে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিবরণ রয়েছে সবিস্তার। এমনই এক বাণীতে মহান আল্লাহ কোরআনুল কারিমের সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন- 'আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা। এহেন বিপদগ্রস্ত অবস্থায় যারা ধৈর্য ধারণ করবে, তাদের সুসংবাদ দাও।' উল্লিখিত আয়াতের মর্মবাণীকে উপজীব্য করেই বর্তমান আলোচনাটি অব্যাহত রাখার প্রয়াস পাব।
বস্তুত মহান আল্লাহ তার প্রিয় মানুষদেরই অধিকতর পরীক্ষার সম্মুখীন করে থাকেন- ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ সত্যটিই বেরিয়ে আসবে। নবী-রাসুল, অলি- গাউস-কুতুব, সুফি-সাধক, বুজুর্গসহ মহান আল্লাহর প্রতি অনুগত ও একনিষ্ঠ মানুষদের নানাবিধ উপায়ে ইহজাগতিক প্রতিকূল পরিস্থিতি ও কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
কোরআনে পাঁচটি বিষয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে; যার প্রথমটি হলো ভয়। ভয়ের আরবি শব্দ হিসেবে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে 'খাউফ'কে। মূলত পবিত্র কোরআনে ভয়ের প্রতিশব্দ হিসেবে নূ্যনপক্ষে বারোটি শব্দের ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করি। কিন্তু আয়াতে উল্লিখিত 'খাউফ' এমন এক বিশেষ ধরনের ভয়, যা আমাদের জীবনে কোনো একটা মুসিবত এসেছে বা আসবে, যা নিয়ে আমরা আতঙ্কে থাকি বা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাই। এ ভয় পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক- যে কোনো ধরনের বিপদ থেকে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুধা বা দারিদ্র্য। এটি মানবজীবনের আরেকটি পরীক্ষার নাম। ইসলামের প্রথম জামানা থেকে আজ অবধি মুসলিম সমাজে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কষ্ট যেন নিত্যসঙ্গী। মহানবীর (সা.) যুগে ক্ষুধার যন্ত্রণায় অনেকেই পেটে পাথর বাঁধলেও বর্তমানে তা আর সে অবস্থায় নেই। তাই বলে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত নই। অভাব-অনটন, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কশাঘাতে মানুষ তার বিবেক ও চরিত্র বিসর্জন দেয় কিনা, মহান আল্লাহ সেই পরীক্ষায় আদম সন্তানকে ফেলে দেন। অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী, ক্ষুধা যাদের জীবনে লেগেই থাকে, তারা পুরোপুরি কৃতজ্ঞশীল হয়ে শান্তি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে সমর্থ হয় না। তৃতীয়ত, সহায়-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি; যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ পরীক্ষা নেবেন। হয়তো অঢেল সম্পদের মালিক কখনও রাস্তার ভিখারি হয়ে যাবেন; সম্পদশালী ব্যক্তি কোনো কারণে নিঃস্ব হয়ে যাবেন। এটিকে স্রষ্টার এক নির্ধারিত পরীক্ষা হিসেবে আমলে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা মহান আল্লাহর; এটি কারও কাছেই চিরস্থায়ী নয়- এ অমোঘ সত্য মেনে নিতে হবে। সম্পদ হাতছাড়া হলেই মাতম শুরু করা চলবে না, বরং পরম আরাধ্যে তা অতিক্রম করতে হবে এবং নিজেকে বোঝাতে হবে- আল্লাহর পরীক্ষা চলছে। আর এ থেকে আমার উত্তরণও ঘটবে। চতুর্থত, জীবনের ক্ষয়ক্ষতি; অর্থাৎ প্রিয়জন, আপনজন হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে যে কঠিন পরীক্ষা, তাও কাটিয়ে উঠতে হবে। সর্বদাই অন্তঃকরণে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল রাখতে হবে- জীবন-মৃত্যু একমাত্র মহান আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনিই জন্ম দেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান। একমাত্র অবলম্বন অনেক সময় ইহধাম ত্যাগ করতে পারে; জীবনটাকে তখন অর্থহীন মনে হতে পারে। চরম প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তখন ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বহন করতে হবে। প্রিয়জনের অকালমৃত্যু, অপমৃত্যু- কত কিছুই না মানবজীবনে ঘটতে পারে! এসবই মহান রবের পরীক্ষা হিসেবে নিতে হবে। পঞ্চমত, ফল-ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতি; অর্থাৎ জমিনে উৎপাদিত পণ্য, ফল বা ফসলাদির নানা কারণে বিপর্যয় ঘটতে পারে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। খাদ্যের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়া, ঋণে জর্জরিত হওয়া, খরা বা বন্যায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়া, নদীভাঙনের কবলে পড়া, ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়া- এসবই সেই প্রতিশ্রুত পরীক্ষার অংশ।
উপরোল্লিখিত পরীক্ষাগুলোয় অবতীর্ণ হয়ে যারা উত্তীর্ণ হবে, তাদের জন্যই রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। নেয়ামতে ভরপুর পরম স্বর্গোদ্যান তথা জান্নাতুল ফেরদাউসের নিশ্চয়তা ব্যতীত তা আর কী হতে পারে!
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন : চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়