পৃথিবীর ৭০ শতাংশের বেশি স্থানজুড়ে রয়েছে সমুদ্র। প্রধানত মানুষের অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে বর্তমানে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক দূষণ বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের দূষণ বলতে মূলত মানবসৃষ্ট বর্জ্যের কারণে সমুদ্রের পানির যে দূষণ হয়, তাকে বোঝানো হয়। সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, কীটনাশকের ব্যবহার, তেল, প্লাস্টিক, নদীভাঙন, শহর ও শিল্প কারখানার বর্জ্য পদার্থ নিস্কাশনসহ নানা কারণে এ দূষণ হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সামুদ্রিক দূষণের চিত্রটি বেশ ভয়ংকর। এদেশে চার শতাধিক নদী আছে, যারা কোটি কোটি টন পলি নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বিষাক্ত বর্জ্য। এই দূষণের প্রভাবও অনেক সুদূরপ্রসারী। এ কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়া থেকে শুরু করে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর বিষাক্ততার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়াও এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রবাল প্রজাতির সংখ্যা ছিল ৬৫। ২০১৬ সালে তা ৪১-এ নেমে এসেছে। পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কোকা-কোলা, গ্রামীণফোন, নেস্‌লে, এইচএসবিসি বাংলাদেশ ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। যেমন, পরিবেশ দূষণ রোধে 'ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়েস্ট' প্রকল্প, পানির অপচয় রোধে 'ওয়াটার রিপ্লেনিশমেন্ট' প্রকল্প ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে কোকা-কোলা বাংলাদেশ। গ্রামীণফোন ২০০৭ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প বা রিনিউঅ্যাবল এনার্জি প্রজেক্ট চালু করে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে গাজীপুর এলাকার কিছু স্কুলে পানির ট্যাঙ্ক ও টয়লেট নির্মাণ করে নেস্‌লে।

২০৩০ সালের ভেতর বর্জ্যমুক্ত পৃথিবী (ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়েস্ট) গড়ার উদ্দেশ্যে কাজ করছে বহুজাতিক পানীয় প্রতিষ্ঠান কোকা-কোলা। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তারা ২০২৫ সালের মধ্যে নিজেদের প্যাকেজিংকে শতভাগ রিসাইকেল্যাবল করে তুলবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্যাকেজিংয়ে ৫০ শতাংশ রিসাইকেল্‌ড উপাদান ব্যবহার করবে। বর্তমানে তাদের প্যাকেজিং ৯০ শতাংশ রিসাইকেল্যাবল। তাদের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।

এছাড়া, ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়েস্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে কোকা-কোলা বাংলাদেশ কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কেওক্রাডং বাংলাদেশের সঙ্গে, যারা ওশান কনজারভেন্সি নামের আন্তর্জাতিক সংগঠনের হয়ে বাংলাদেশে সমন্বয়কের কাজ করে। উপকূলীয় ও সামুদ্রিক দূষণ রোধে সবার মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে শুরু করে তারা সেন্টমার্টিন দ্বীপে ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিনআপের আয়োজন করছে। প্রতিবছর স্বেচ্ছাসেবীদের একটি দল সেন্টমার্টিনে জড়ো হয়ে সমুদ্রসৈকতে জমে থাকা বর্জ্য পরিস্কার করে। এই দলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যুক্ত থাকেন। গত ১০ বছরে ৪৫০০ স্বেচ্ছাসেবী ১২,০০০ কিলোগ্রামের বেশি সামুদ্রিক বর্জ্য সংগ্রহ করেছেন। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষ সামুদ্রিক দূষণের ভয়াবহতা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠছেন। একইসঙ্গে এ ব্যাপারে নিজের জায়গা থেকে অবদান রাখতেও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
নিজেদের স্বার্থেই আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণে মনোযোগী হওয়া উচিত। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা প্রয়োজন। ইন্টারন্যাশনাল কোস্টাল ক্লিনআপের মতো আয়োজনগুলো আমাদের সেই বিষয়টিই মনে করিয়ে দেয়।

সাংবাদিক
mizanshajahan@gmail.com