শুরু করা যাক শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য ধরে। তিনি সাংবাদিকদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়ার কথা বলেছেন। আমি মনে করি, চলমান পরিস্থিতির আলোকে এটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়। আমরা দেখেছি, এ বছর এরই মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা যেমন সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি এসএসসি ও এইচএসসির পাবলিক পরীক্ষাও সেভাবে সম্পন্ন হয়েছে। করোনা-দুর্যোগের কারণে সরকার সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যারা এসএসসি ও এইচএসসি সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা কেমন হবে। বস্তুত শিক্ষামন্ত্রী সেটাই খোলাসা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এ ব্যবস্থাটি স্থায়ী নয়; সংকটকালের জন্য।
গত ৩০ ডিসেম্বর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এ বছর সব বোর্ড মিলে ৯৪ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। আমরা মনে করি, এটা ছোট সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের বড় সাফল্য। আমরা জানি, অতিমারির কারণে প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। এর পর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে তিন বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। যে কারণে এসএসসিতে এবারের সাফল্যের হারও প্রত্যাশিত বলা চলে। বলা বাহুল্য, এ সময়ের শিক্ষা পুরোটাই নির্ভর করছে করোনার ওপর।
আমরা জানি, গত বছর সব শিক্ষার্থীকে অটোপাস দিয়ে পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলের আলোকে তাদের ফল তৈরি করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অনলাইনে এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষার্থী অনেকেই করোনাকালীন দেড় বছর প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। অনেকে নিকটাত্মীয় হারিয়েছে। কারও পরিবার হয়তো অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। ডিসেম্বরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের এইচএসসি পরীক্ষায় যারা অংশ নিয়েছে, সেখানে এসব শিক্ষার্থীও ছিল নিশ্চয়। তাদের যখন ফল প্রকাশ হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয় আসবে তখন সিলেবাস কী হবে- স্বাভাবিকভাবেই তা এখন ভাবার সময়। ভর্তি পরীক্ষায় তাদের জন্য সংশ্নিষ্ট বিষয়গুলোতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুসরণ করা যেতেই পারে। তবে শিক্ষামন্ত্রী এটাও বলেছেন, সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা ভিন্ন হবে। আমিও এটাই যথোচিত মনে করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কথা যদি বলি, আমরা ভর্তি পরীক্ষায় শুধু শিক্ষার্থীদের একাডেমিক বিষয়গুলোই যাচাই করি না; একই সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের দেশের ও দেশের বাইরের জ্ঞানের পরিধিও নির্ণয় করি। আমরা মনে করি, দেশের একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়ন করবে, তখন তার সাধারণ জ্ঞান থাকা উচিত। একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক জ্ঞানের মাধ্যমেই বস্তুত জ্ঞানার্জন পূর্ণতা পায়। সে জন্য আগামী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় একাডেমিক বিষয়ের সিলেবাস সংক্ষিপ্ত হলেও সাধারণ বিষয়গুলো আগের মতোই থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।


তবে এটা ঠিক, পরিস্থিতির কারণে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা হলেও মৌলিক বিষয়গুলো যাতে শিক্ষার্থীরা শিখতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। যেসব অধ্যায় কিংবা বিষয় জরুরি, সেগুলোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে আশা করা যায়, শিক্ষার্থীরা বাকি বিষয়গুলোও সহজে উতরে যেতে পারবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বিষয়টি কোনো সমস্যা তৈরি করবে বলে আমি মনে করি না। বলা বাহুল্য, বিশ্বের অন্যান্য পরিস্থিতিও আমরা দেখছি। প্রতিটি দেশ তাদের মতো করে করোনার এই সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বিশেষ করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে শিক্ষা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে প্রত্যেকে তাদের অবস্থার আলোকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রতিবেশী ভারতেও সিলেবাস ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংক্ষেপ করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সংকটকালের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের আন্তরিকতা আমরা দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আমরা সেটি নিশ্চিত করতে চাই। করোনাকালে শিক্ষা নিতে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, তা প্রশাসনকে দেখতেই হবে। তবে এটাও মনে রাখা চাই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী একাডেমিক শিখনশূন্যতায় পড়লেও তারা যে সংকটকালীন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, সে অভিজ্ঞতাও শিক্ষারই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এ সময়ে যারা অটোপাস করেছে কিংবা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের অন্যভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীরা এ সময়ে যারা ভালো করছে, স্বাভাবিক সময়েও তারা হয়তো আরও ভালো করত এবং ভবিষ্যতেও তারা ভালো করবে নিশ্চয়ই।
করোনা সংক্রমণের হার মাঝে কমে গেলেও নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। বিশেষ করে, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের দাপট বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা যাচ্ছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় করোনা ও ওমিক্রন বাড়ার কারণে সেখানে জারি হয়েছে করোনা-সংক্রান্ত একাধিক বিধিনিষেধ। দেশেও করোনায় নতুন রোগী শনাক্তের হার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মৃত্যু। ফলে আমাদের শঙ্কারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সেদিক থেকে সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম যা-ও শুরু হয়েছে, সেখানে ছেদ পড়তে পারে। সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখা সম্ভব হবে না বলে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরই মধ্যে করোনার চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করেছি নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে। শিক্ষাক্ষেত্রে দূরবর্তী শিখন নিশ্চিতে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যাদের ডিভাইস সংকট ছিল, তাদের অনেককেই সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন, সরকার সবাইকে টিকার আওতায় আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেও টিকা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আমি আগেও বলেছি, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাই আমাদের অগ্রাধিকার।
সবাই যখন টিকার আওতায় চলে আসবে এবং একই সঙ্গে করোনার ওষুধও সহজলভ্য হয়ে যাবে; এর মাধ্যমে এই অতিমারি থেকে মুক্তির একটা পথ স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরাও আশা করছেন, চলতি বছরেই শেষ হবে এ বিভীষিকা। তার আগ পর্যন্ত আমাদের সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই। শ্রেণি কার্যক্রম স্বল্প পরিসরে চলা কিংবা বন্ধ হওয়া- সবই পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে; অন্তত এ বছরের জন্য হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা সে সিলেবাসের আলোকে হওয়াই যুক্তিসংগত। এর মধ্যেও নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রশ্নের ধরন নিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করতে পারবে। সরকারের নির্দেশনার আলোকে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যেভাবে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটিই নিতে হবে।
ড. সাদেকা হালিম :ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও অধ্যাপক সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়